তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চল এবং জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমের দ্বীপপুঞ্জগুলোতে আঘাত হানার পর শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ এখন চীনের পূর্বাঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
টাইফুনের প্রকোপে পড়া এলাকাগুলোতে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির কারণে গাছপালা উপড়ে গেছে এবং হাজার হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীনে ৯ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
চলতি সপ্তাহে চরম আবহাওয়ার কারণে ইতোমধ্যে দক্ষিণ ও মধ্য চীনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এ সপ্তাহের ঝড়ে সেখানে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছে, বেশকিছু নদীর পানি উপচে পড়েছে এবং একটি জলাধারের বাঁধ ভেঙে গেছে।
টাইফুন ‘বাভি’ আগামীকাল রোববার (১২ জুলাই) ভোরে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ঝেজিয়াংয়ের এক কোটি লোক অধ্যুষিত রাজধানী ওয়নঝউয়ের কাছাকাছি স্থলভাগে আঘাত হানবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার রাতের মধ্যে সেখান থেকে প্রায় ৯ লাখ লোককে তাদের ঘরবাড়ি থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ওয়েনঝউ শহর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেকোনো চরম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কোনো প্রকার প্রচেষ্টা না চালিয়ে সম্পূর্ণ আগাম এবং সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, টাইফুন বাভির প্রভাবে পূর্ব ঝেজিয়াং এবং উত্তর-পূর্ব ফুজিয়ান প্রদেশে ‘অস্বাভাবিক’ ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসের কারণে বাসিন্দারা তাদের দোকান-পাটের সুরক্ষায় ধাতব শাটারগুলো কাঠ দিয়ে আটকে দিচ্ছে এবং জানালার কাঁচে টেপ লাগাচ্ছে।
চীনের সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটির উত্তরে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে এক লাখেরও বেশি মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বন্যার পানি আটকে রাখার জন্য রাজধানীর মিয়ুন জলাধার থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, উত্তর তাইওয়ানের রাস্তাঘাটগুলো এখনো অনেকটাই জনশূন্য। সেখানে ঝড় ও বৃষ্টির কারণে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ রয়েছে।
ঝড়ের কারণে তাইওয়ানে ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং এক লাখের বেশি পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
তাইওয়ানের বন্দর নগরী কিলুং-এর ৫০ বছর বয়সী একজন খাবারের দোকানদার বলেন, ‘সবাই এই বৈরী আবহাওয়াকে ভয় পাচ্ছে এবং ঘরের ভেতরে থাকছে, কিন্তু আমি শুধু কিছু অর্ডার থাকার কারণে বাইরে এসেছি। অনেকে জরুরি দায়িত্বে আছেন এবং তাদের খাওয়ার মতো কিছু নেই, তাই আমাকে এখনো তাদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে হচ্ছে।’
গত সোমবার ‘বাভি’ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ গুয়াম এবং উত্তর মারিয়ানায় ‘সুপার টাইফুন’ হিসেবে আঘাত হানার পর কিছুটা দুর্বল হয়ে সাধারণ টাইফুনে পরিণত হয়।
তাইওয়ানের সেন্ট্রাল ওয়েদার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিডব্লিউএ) জানিয়েছে, আজ শনিবার (১১ জুলাই) বাভির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ কমে ঘণ্টায় ১৩৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে এবং এর দমকা হাওয়ার গতি ছিল ঘণ্টায় ১৭৩ কিলোমিটার।
মৃতের সংখ্যা বাড়ছে
ফিলিপাইনে বাভির প্রভাবে সৃষ্ট ভারি বর্ষণের ফলে সৃষ্ট ভূমিধস এবং অন্যান্য দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ মিন্দানাওয়ের বাসিন্দা।
পুরো দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে প্রায় ১১ হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। এছাড়া, ১২টির বেশি বন্দর বন্ধ রয়েছে ও সেসব স্থানে ৩১৩টি নৌযান নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে।
টাইফুন ‘বাভি’ জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতে আঘাত হানার ফলে ওকিনাওয়া জুড়ে ১৮ হাজারের বেশি বাড়িঘর ও স্থাপনা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে মিয়াকো অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাপানি এয়ারলাইন্সগুলো বেশকিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস মেরিন সার্ভিস গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, সাগরে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়গুলোকে উষ্ণ সমুদ্র আরও শক্তিশালী হতে সাহায্য করে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে ভারি বৃষ্টিপাত হিসেবে ঝরে পড়ে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে চলতি বছরে ‘এল নিনো’র প্রত্যাবর্তন। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া যা প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ঘটে থাকে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

