দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে স্বচ্ছতা জোরদার, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি) একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন (MIOB) মোবাইল ফোন শিল্পের সকল স্টেকহোল্ডারের স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিফলনের জন্য কাজ করে, এবং বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও প্রবৃদ্ধি-মুখী টেলিকম ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করে।
মঙ্গলবার (০৬ই জানুয়ারি) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা হোটেলে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল `এনইআইআর-এর হাত ধরে শুরু হোক নিরাপদ বাংলাদেশ`।
সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব, ভোক্তা সুবিধা এবং দেশের মোবাইল ফোন ইকোসিস্টেমে এর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনার নিন্দা জানানো হয় এবং এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। এতে এমআইওবি`র সদস্যবৃন্দসহ শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এ সময় এমআইওবি জানায়, সরকার ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বৈধ আমদানিকে উৎসাহিত এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্মার্টফোন আমদানি শুল্ক হ্রাসের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। সংগঠনটির মতে, এসব নীতিগত উদ্যোগ মোবাইল ফোন শিল্পে দীর্ঘদিনের অনিয়ম কমাতে এবং একটি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
আলোচনায় বলা হয়, এনইআইআর কার্যকর হওয়ার ফলে অবৈধ, নকল ও চুরি হওয়া মোবাইল ফোন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, যা সরাসরি ভোক্তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে অবৈধ আইএমইআই ব্যবহার বন্ধ হওয়ায় ফোন ক্লোনিং, প্রতারণা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
বক্তারা আরও বলেন, এই উদ্যোগ বাজারে বৈধ ব্যবসা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। এমআইওবি`র তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৮টি স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এই খাতে সরাসরি ৫০ হাজার দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি ডিলার, ডিএসআর, সার্ভিস ও খুচরা বিক্রয়সহ আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক সক্রিয়ভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে এই শিল্প থেকে সরকার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর, মজুরি ও ইউটিলিটি বিল আয় করছে।
`এমআইওবি`র বক্তারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানায়, এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কিছু অবৈধ স্মার্টফোন ব্যবসায়ীর সহিংস ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় একটি সীমিত গোষ্ঠী-যারা দেশের প্রায় ১২ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার, স্মার্টফোন আমদানি শুল্ক হ্রাসের দাবি মেনে নেওয়ার পরও বেআইনি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে।
এমআইওবি আরও জানায়, এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বহিরাগতদের এনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, বিটিআরসি কার্যালয়ে ভাঙচুর, শিশুদের ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈধ মোবাইল ফোনের দোকান জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
সংগঠনটির মতে, আইনবহির্ভূত এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করছে না, বরং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর নির্ভরশীল স্মার্টফোন শিল্পে এ ধরনের অস্থিরতা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু চলমান বিনিয়োগ নয়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োেগ প্রবাহ ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আগ্রহকেও নিরুৎসাহিত করতে পারে। এমআইওবি মনে করে, যেকোনো নীতিগত মতভেদ শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে সমাধান হওয়া উচিত এবং বৈধ ব্যবসা ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ জরুরি।
এ প্রসঙ্গে এমআইওবি সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, "এনইআইআর বাস্তবায়ন দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে অবৈধ ও নকল মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং বাজারে বৈধ ব্যবসা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বিটিআরসি কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরসহ যেকোনো সহিংস ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানান। নীতিগত ধারাবাহিকতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকলে স্মার্টফোন শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, মোঃ জহিরুল ইসলাম, সাইফুদ্দিন টিপু, আব্দুল্লাহ আল হারুন, ইমাম উদ্দিন সহ অনেকেই।
একুশে সংবাদ/রাফি/বাবু/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

