শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাঘড়া লস্কর গ্রামে অবস্থিত ৪১৮ বছরের পুরোনো `ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ` মোগল আমলের স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন।
১৬০৮ সালে নির্মিত এই ঐতিহাসিক এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে। এটি সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
কথিত আছে, পালানো খা ও জব্বার খা দুই ভাই কোনো এক রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন। কয়েকশ বছর আগে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দুই ভাই বাংলার ঝিনাইগাতি এলাকায় আশ্রয় নেন এবং সেখানে মসজিদটি নির্মাণ করেন।
মসজিদটির বিশেষত্ব হলো, এর ইটগুলো চারকোণা টালির মতো। ইতিহাস থেকে জানা গেছে, আজ থেকে প্রায় ছয়-সাতশ বৎসর আগে এ ইটের ব্যবহার ছিল। মসজিদের আস্তরণে ঝিনুক চূর্ণ অথবা ঝিনুকের লালার সঙ্গে সুরকি, পাট বা তন্তু জাতীয় আঁশ ব্যবহার করা হয়েছে।
এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির নির্মাণ কৌশল গ্রিক ও কোরিন থিয়ান রীতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। মসজিদটির দরজায় কষ্টি পাথরে খোদাই করা আরবি ভাষায় নির্মাণকাল দেওয়া ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে কষ্টিপাথরটি চুরি হয়ে যায়। মসজিদটির বয়স সঠিকভাবে কেউ বলতে না পারলেও কারুকার্য, নির্মাণশৈলী থেকে ধারণা করা হয়, এটি বক্সার বিদ্রোহী হিরঙ্গী খানের সময়কালে নির্মাণ করা হতে পারে।
একটি বিশাল আকৃতির গম্বুজ এবং এক দরজা বিশিষ্ট মসজিদটি বর্গাকৃতির। এর দৈর্ঘ ও প্রস্থ ৩০ ফুট। মসজিদের ভেতরে দুটি সুদৃঢ় খিলান আছে। মসজিদের ওপরে একটি গম্বুজকে ঘিরে ছোট-বড় মিনার আছে ১২টি। ভেতরে মেহরাব ও দেওয়ালে বিভিন্ন রঙের ও কারুকার্যে ফুল ও ফুলদানি শোভা পাচ্ছে। মসজিদটির দেওয়ালের প্রস্থ বা ব্যাস ৪ ফুট, যার গাঁথুনি চুন ও সুরকি দিয়ে করা।
খাঁনবাড়ির খান বংশের লোকজনের ওয়াকফ করা ৫৮ শতাংশ জমির বিশাল এলাকা নিয়ে প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খাঁনবাড়ি জামে মসজিদ। তবে মূল ভবন ও বারান্দা আছে ১৭ শতাংশ জমির ওপর আর বাকি ৪১ শতাংশ জমিতে আছে কবরস্থান।
তবে পরিচর্যার অভাবে এখন বেশ নাজুক অবস্থায় আছে মসজিদটি। যদিও কয়েক বছর ধরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মসজিদটির মেরামত ও সৌন্দর্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলছে।
মসজিদের ভেতর ইমাম ছাড়া তিন কাতারে দশ থেকে বারোজন করে মোট ৩০ থেকে ৩২ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মসজিদের বাইরে বারান্দায় আরও কমপক্ষে ১০০ জন মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন। সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
এ ছাড়া মসজিদের সামনে ৪১ শতাংশ জায়গায় কবরস্থান। মসজিদের নির্মাণ কৌশলে গ্রিক ও কোরিন থিয়ান রীতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। তবে চুরি যাওয়া মোগল আমলের খোদাই করা পাথরটির দাম কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। চুরি যাওয়া পাথরটি দীর্ঘদিনেও উদ্ধার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসল্লিরা।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. ফেরদৌস খান বলেন, ‘প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। বংশ পরম্পরায় দাদার পর বাবা, এখন আমি দায়িত্বে আছি। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়। ইমাম ও মুয়াজ্জিন আছেন।’
তিনি বলেন, ‘মসজিদের নামে দুটি পুকুর আছে। এর আয় দিয়ে বিভিন্ন খরচ বহন করা হয়। দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ এ মসজিদ একনজর দেখতে ছুটে আসেন। আগে ভেতরের কারুকাজে আলাদা আলাদা রং ছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে সাদা রং করে দেওয়ায় আগের সৌন্দর্য আর দেখা যায় না। কেবল সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন জৌলুস হারাচ্ছে। তাই সরকারের সহযোগিতা চাই।’
ভয়েজ অব ঝিনাইগাতীর আহ্বায়ক জাহিদুল হক মনির বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভ্রমণপিপাসুরা এবং মুসল্লিরা ৪১৮ বছরের পুরোনো এ মসজিদে আসেন। তারা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু তথ্য সংগ্রহশালা বলতে এখানে তেমন কিছুই নেই। পাথরটাও চুরি হয়ে গেছে। আমরা মসজিদের কিছু কাজের জন্য সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা চাচ্ছি।’
ইসলামিক ফাউন্ডেশন শেরপুরের উপপরিচালক এসএম মোহাইমোনুল ইসলাম গণমাধ্যামকে বলেন, ‘শেরপুরের ঐতিহাসিক ইসলামিক নির্দশন খাঁনবাড়ি মসজিদ। এখানে বহু পর্যটক, গবেষক আসেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো সংগ্রহশালা নেই। এলাকাবাসীর দাবি সাপেক্ষে মোগল আমলের এ মসজিদের ব্যাপারে দ্রুত সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পর্যটন কর্পোরেশন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করবো।’
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

