লক্ষ্মীপুরে মানসম্মত বিনোদন কেন্দ্রের অভাব থাকায় ঈদের ছুটিতে মেঘনা নদীর তীর যেন ‘মিনি কক্সবাজারে’ রূপ নেয়। বিশেষ করে রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার এলাকার মেঘনা নদীর তীরবর্তী ভাঙনরোধ বাঁধ এখন শুধু নদীভাঙন থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে না, গড়ে তুলেছে একটি আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র।
বাঁধের ওপর দাঁড়ালে দৃষ্টিসীমাজুড়ে দেখা যায় বিস্তীর্ণ জলরাশি। জোয়ার-ভাটার ঢেউ এসে ছুঁয়ে যায় তীর, আর নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া শীতল বাতাস এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। চারপাশের শান্ত পরিবেশ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মনকে মুহূর্তেই মোহিত করে তোলে। ঈদের ছুটিতে তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই ছুটে আসছেন এই মনোরম নদীতীরে।
বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের দিন থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ-সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’।
মেঘনা উপকুলীয় এই অঞ্চলে রায়পুর ও সদরে আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণ চাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকা ভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালু চরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি-সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।
ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকুরীজিবী হেলাল আহম্মেদ। তারা বলেন, ‘জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে। এখান প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়।’
খুশবু আক্তার নামের এক গৃহবধূ ও কলেজ ছাত্রী বলেন, ‘স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে এসে সমুদ্র সৈকতে ঘোরার মতোই আনন্দ পাচ্ছি। নদীতে জেলেদের ইলিশ ধরার দৃশ্য দেখছি। খুবই ভালো লাগছে। ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর।’
ঈদ উপলক্ষে আশপাশের জেলা থেকেও নানা বয়সী মানুষ ভিড় করছেন এখানে। ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে বাসস’কে বলেন, ‘জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন।’
সেই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধ নির্মাণ দ্রুত শেষ করা দরকার।’
তবে বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। নদীতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকরা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
এ বিষয়ে ট্রলার চালক কিরন মাজি বলেন, ‘১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার-ভাটা বুঝেই চলাচল করি। জোয়ারের সময় যাত্রী তুলি না। এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।’
সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস সব একসঙ্গে মিলিয়ে রায়পুর-রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন সত্যিই আরেক কক্সবাজার।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

