মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভায় ১৫৫টি পদের বিপরীতে ১৪৪টি পদেই জনবল শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ২ কর্মকর্তা এবং ৯ কর্মচারী দিয়ে চলছে পৌরসভার কার্যক্রম।
পৌরসভা গঠনের ৯০ বছরেও স্থাপন হয়নি পৌরসভার স্থায়ী ময়লার ডাম্পিং স্টেশন। শহরের কলেজ রোডের খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং করায় এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকায় পচে-গলে বর্জ্যের দুর্গন্ধে বিপর্যন্ত হচ্ছে পরিবেশ।
হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য ও জীববেচিত্র্য। প্রায় শতবর্ষেও পৌরসভার আয়তন বাড়েনি। এখনো ২.৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনেই সীমাবদ্ধ।
পৌরসভা আইন অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পৌরসভার সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রকৌশলী বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ ও স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পানা বিভাগের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৫৫টি পদে জনবল নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিন্তু শ্রীমঙ্গল পৌরসভা গঠনের ৯০ বছর তাতিবাহিত হলেও স্থায়ী ১১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দিয়ে চালানো হচ্ছে পৌরসভার কার্যক্রম।
পৌরসভার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায় সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রকৌশল বিভাগে ৬৮টি পদের বিপরীতে শূন্য পদ আছে ৫২টি, প্রশাসনিক বিভাগে ৫৪টি পদের বিপরীতে শূন্য পদ ৪৯টি এবং স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ৩৩টি পদের ৩৩টি পদই শূন্য।
প্রথম শ্রেণির পৌরসভার নাগরিকরা ১০ থেকে ১২ ধরনের সেবা পাওয়ার কথা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যাত্রীছাউনি, সড়ক বাতি, যানবাহনের পার্কিং স্থান ও বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ, শিক্ষা, খেলাধুলা, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ। কিন্তু কাগজে-কলমে পৌর নাগরিক হলেও এখনো অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত পৌরবাসী।
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ২.৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীমঙ্গল পৌরসভা। ২০০২ সালে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন পদে জনবল সংকটে দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকে ধুঁকে চলছে পৌরসভার কার্যক্রম। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, এটা শুধু নামমাত্র প্রথম শ্রেণির পৌরসভা।
২৪ বছরেও প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। ফুটপাত-ছড়া দখল করে বিভিন্ন স্থানে দোকাপাঠ, স্থাপনা নির্মাণ, রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, সৌন্দর্যবর্ধন ব্যবস্থাপনা ভঙ্গুর, ড্রেনেজ ব্যবস্থায় নাজুক। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা। দীর্ঘ ৯০ বছরেও পৌরসভার আয়তন বাড়েনি।
গড়ে ওঠেনি স্থায়ী ময়লার ডাম্পিং স্টেশন। অনেক নাগরিক সুবিধা এখনো নিশ্চিতি হয়নি পৌরবাসীর। পৌরসভার স্থায়ী ময়লার ভাগাড় না থাকায় কলেজ রোডে তিনটি প্রতিষ্ঠানের সামনে ময়লা আবর্জনার স্তুপে পাহাড়সম হয়ে আছে। ফলে পরিবেশ দূষিত হয়ে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
টিআইবি ও সচেতন নাগরিক কমিটির সহযোগী সংগঠন অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপ (এসিজি) শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদস্য আশিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, পৌরসভা গঠনের ৯০ বছরেও পৌরসভার আয়তন বাড়েনি। এখনো ২.৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনেই সীমাবদ্ধ। অথচ দুই যুগ আগেই শ্রীমঙ্গল পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। কিন্তু এখানকার নাগরিক সুবিধা এবং সেবার মান এখনও প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মতো হয়নি।
শহরতলীর মুসলিমবাগ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রায়হান ভুইয়া বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে শুনে আসছি পৌরসভা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতে মুসলিমবাগসহ বিভিন্ন এলাকা পৌরসভার অর্ন্তভুক্ত করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পৌরসভার আয়তন আর বাড়েনি। পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ করার অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।
পৌরসভার নাগরিক মনহত শর্মা বলেন, ৯০ বছরে এ পৌরসভায় জনসংখ্যা, বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশ-বিদেশের পর্যটকের আগমন বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের বর্জ্য ও মানববর্জ্যের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৯০ বছরে ও এখনো প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থায়ী ময়লার ডাম্পিং স্টেশন গড়ে ওঠেনি। ফলে কলেজ সড়কে অবস্থিত ময়লার ভাগাড়ের আশপাশের বাসিন্দাদের বেশিরভাগ পরিবারেই রোগবালাই লেগে আছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ময়লার ভাগাড়ে পৌরসভার ময়লাবাহী গাড়িগুলো একেক করে আসছে, ময়লা ফেলে চলে যাচ্ছে। কিন্তু ওই ভাগাড়ে ময়লা ফেলা হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। ভাগাড়ের চারদিক ময়লার স্তুপ পাহাড়সম হয়ে পড়েছে। বর্জ্যের দুর্গন্ধ এক-দেড় কিলোমিটার ছড়াচ্ছে। মশা-মাছির উৎপাত এবং উৎকট গন্ধে ওই এলাকায় থাকাটা দায় হয়ে পড়েছে। অপরদিকে জনবল সংকটের কারণে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পৌরবাসী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পৌরসভার শূন্য পদে অন্তত জনবল পদায়ন করলেও নাগরিক সেবা কার্যক্রম আরও গতি ফিরবে।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৭ সালে উপজেলার সদর ইউনিয়নের জেটি রোড এলাকায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দিয়ে নতুন ভাগাড়ের জন্য ২ দশমিক ৪৩ একর জমি ক্রয় করা হয়েছিল। সেসময় জমিতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় ওই এলাকার এক ব্যক্তি আদালতে মামলা করেন। এ মামলার প্রেক্ষিতে আদালত ২০২৩ সালের ১৩ মে পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের কারণে পৌরসভা থেকে উদ্যোগ নেওয়া কলেজ সড়ক ময়লার ভাগাড় অপসারণের কাজটি বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে ২ জন কর্মকর্তা ও ৯জন কর্মচারি দিয়ে পৌরসভায় সকল কার্যক্রম আন্তরিকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রথম শ্রেণি পৌরসভা হলেও এখানে সাংগঠনিক কাঠামো আনুযায়ী জনবল অনুমোদন হয়নি। অবসরজনিত কারণেও কিছু জনবল শূন্য হয়েছে। বর্তমান জনবল আছে তৃতীয় শ্রেণির পৌরসভা থেকেও কম। জনবল নিয়োগর জন্য জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
ময়লার ভাগাড় বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, পৌরসভায় স্যানেটারি ল্যান্ড ফিল্ড এবং ফ্যাকাল স্ল্যাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে ২১ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার একটি প্রজেক্ট গত বছর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।
এটি অনুমোদন হলে মৌলভীবাজার সড়কের জেটি রোডস্থ ভাড়াউড়া মৌজায় ২.৪৩৮৩ একর নিজস্ব ভূমিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে পৌরসভা; সীমিত জনবল নিয়ে আমরা পৌরবাসীকে যথাসম্ভব আন্তরিকভাবে সকল নাগরিক সেবা প্রদান করে আসছি।
শূন্য পদে জনবল নিয়োগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজ করছে, আশা করছি দ্রুততম সময়েই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। একইসঙ্গে পৌরসভা বর্ধিতকরণের বিষয়ে ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন অফিসে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং পৌরসভার ময়লার জন্য স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের বিষয়টি অগ্রাধিকার বিবেচনাপূর্বক তা নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা অব্যাহত আছে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

