রাজধানী ঢাকার অদূরে অবস্থিত গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, উপজেলার হাজার হাজার মানুষের ঢাকায় সরাসরি যাতায়াতের জন্য এখানে নেই কোনো বাস সার্ভিস।
গত দুই যুগেও এ অঞ্চলের অবকাঠামোগত ও পরিবহন ব্যবস্থার তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ লেগুনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে যাতায়াত করে আসছে। দীর্ঘদিন যাবৎ এ সমস্যা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনরুপ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহন করেন নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকাগামী যাত্রীদের সকাল থেকেই কালীগঞ্জ বাজার বাসস্ট্যান্ড ও পুরাতন সোনালী ব্যাংকের মোড়ে লেগুনার অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন। অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন লেগুনার সংখ্যাও বেড়ে কালীগঞ্জ এখন যেন লেগুনার নগরীতে পরিনত হয়েছে। লেগুনায় অতিরিক্ত যাত্রী বহনের ফলে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে এবং একাধিক যানবাহন বদল করে গন্তব্যে পৌছাতে ভোগান্তি এখন চরমে।
চাকরিজীবি কাজী লোকমান হোসেন বলেন, অফিসে পৌঁছাতে ভোরে বের হই। সরাসরি বাস না থাকায় টঙ্গীতে নেমে অন্য পরিবহনে উঠতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। বিকল্প আর কোন পরিবহন না থাকায় বাধ্য হয়েই লেগুনায় যেতে হচ্ছে।
চালকরা ইচ্ছে মত পার্কিং ও পুরো রাস্তা বন্ধ করে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। পুরাতন সোনালী ব্যাংক মোড়ে ও বাজার সন্নিকটস্থ বটতলা মোড়ে সারাক্ষণ ট্রাফিকজ্যাম লেগেই থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদাসীন কেন? শিক্ষার্থীদেরও একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, রাজধানীর বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াতে পরিবহন সংকট সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেগুনার পরিবহন শ্রমিক বলেন, কালীগঞ্জ হতে টঙ্গি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৪০/৫০ টি পুরাতন লেগুনা চলাচল করে। যাদের নেই বৈধ রুট পারমিট ও ড্রাইভারদের নেই লাইসেন্সসহ বৈধ কাগজপত্র। লেগুনাগুলো মূলত মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন মাইক্রোবাস বা পিকআপের নতুন সংস্করণ। প্রশ্ন হচ্ছে লেগুনার বিকল্প কী? কর্তৃপক্ষ কি এর কোনো বিকল্প ভেবেছেন?
কালীগঞ্জ বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ঢাকার পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনা-নেওয়ায় একাধিকবার গাড়ী পরিবর্তন করতে হয়। এতে করে পণ্যের পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায় ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কালীগঞ্জ ট্রান্সপোর্ট লিঃ (KTL) পরিবহনের সাবেক পরিচালক হাজী মো. আফতাব উদ্দিন জানান, ২০০৮ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক কারনে উক্ত পরিবহনটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে কালীগঞ্জ-টঙ্গী-ঢাকা রুটে বাস সার্ভিস চালু করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সাথে একাধিক বৈঠক করা হয়। প্রশাসনের সহযোগিতায় বিআরটিএ-এর অনুমতিক্রমে ৪০ টি বাস দিয়ে সার্ভিসটি চালুর উদ্যোগ গ্রহন করলেও অদৃশ্য কারনে সার্ভিসটি তখন আর চালু করা সম্ভব হয়নি।
বাসের মালিক ও কালীগঞ্জ ট্রান্সপোর্ট লিঃ (KTL) এর পরিচালক মো. সেন্টু বলেন, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ কালীগঞ্জ টু গুলিস্তান রুটে ১১০ টি বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু পরিবহনটি চালু করার জন্য কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সাথে একাধিক বৈঠক করার পরেও এখনো পর্যন্ত মৌখিক বা লিখিত কোন অনুমতি দিচ্ছে না। কেন অনুমতি দিচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি প্রশাসনের উদাসিনতাকেই দায়ী করছেন।
গাজীপুর বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এস.এম মাহফুজুর রহমান মুঠোফোনে প্রতিবেদককে বলেন, পরিবহন মালিকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৫ টি বাসের কাগজপত্র যাচাই বাছাইয়ে বৈধ প্রতিয়মান হয়েছে। নির্ধারিত বাসস্টেন্ড, যাত্রী উঠা-নামা করার টিকেট কাউন্টার বা স্টপেজের নাম ও ভাড়ার তালিকাসহ বিভিন্ন তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করলেই এই রুটে বাস সার্ভিস চালু হতে কোন বাধা থাকবে না।
বাস সার্ভিস চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম কামরুল ইসলাম প্রতিবেদক কে বলেন, ‘‘এলাকার পরিবহন ব্যবস্থা পূর্ব হতেই অত্যন্ত নাজুক। সমস্যা নিরসনকল্পে পরিবহন সেক্টরের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা ফলপ্রসু। নিরাপদ গণপরিবহন চালু করা কালীগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। বাস সার্ভিস চালু হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে, সময় ও যাতায়াত সাশ্রয়ী হবে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড আরও গতিশীল হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষে সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে।"
যাত্রীদের ভাষ্যমতে আ’লীগ সরকারের আমলে লোক দেখানো বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু হলেও তা টেকসই হয়নি। এলাকাবাসীর দাবি, কালীগঞ্জ-টঙ্গী-ঢাকা রুটে দ্রুত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে নিয়মিত বাস সার্ভিস চালু করা হলে কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আধুনিক গণপরিবহন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সাংসদ এ.কে.এম ফজলুল হক মিলনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

