AB Bank
  • ঢাকা
  • রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

মৌলভীবাজারে ক্লিনিকে চিকিৎসাবঞ্চিত গ্রামীণ মানুষ, ওষুধ সংকট, বাড়ছে ভোগান্তি



মৌলভীবাজারে ক্লিনিকে চিকিৎসাবঞ্চিত গ্রামীণ মানুষ, ওষুধ সংকট, বাড়ছে ভোগান্তি

মৌলভীবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বর্তমানে তীব্র ওষুধ সংকট, জনবল ঘাটতি এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। জেলার ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশই এখন কার্যত ওষুধশূন্য অবস্থায় রয়েছে।

ফলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি ও সাধারণ রোগের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্লিনিকগুলোতে অন্তত ২৭ ধরনের ওষুধ থাকার কথা থাকলেও প্রায় এক বছর ধরে অধিকাংশ ক্লিনিকে প্যারাসিটামল ও স্যালাইন ছাড়া তেমন কোনো ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক এবং নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লিনিকে এসেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে রোগীদের।

মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার শ্রীমঙ্গল, রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও সদর উপজেলায় মোট ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একজন সিএইচসিপি সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিকে তাদের উপস্থিতি নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার অধিকাংশ ক্লিনিকে জনবল সংকট চরমে, আর দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনিয়মিত উপস্থিতিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে এই জনপদের কয়েক হাজার মানুষের একমাত্র চিকিৎসাস্থল।

এতে গর্ভবতী নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপস্থিত থেকে সেবা প্রদান করার কথা। কিন্তু সময়মতো উপস্থিত না থাকা বা বিনা কারণে অনুপস্থিত থাকা নিয়মের পরিপন্থী। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষেরা স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খেয়ালখুশি মতো চলতে থাকায় বেশিরভাগ ক্লিনিকে অনিয়ম যেন হয়ে গেছে নিয়ম।দায়িত্বরত কর্মীদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং দায়িত্ব অবহেলার কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকের শতভাগ সুফল পাচ্ছে না উপকারভোগীরা ।ফলে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

সরেজমিনে জেলার ২১টি ক্লিনিক ঘুরে অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাইয়ারকুল, কাকিয়াছড়া ও সাইটুলা ক্লিনিকসহ রাজনর উপজেলার সালন ও অন্তেহরী কমিউনিটি ক্লিনিকে নির্ধারিত সময়ে তালাবদ্ধ অবস্থার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক ক্লিনিক সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন খোলা থাকে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গত বৃহস্পতিবারসহ কয়েকদিন শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের লাইয়ারকুল কমিউিনিটি ক্লিনিকে দুপুরে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, কর্তৃপক্ষের ইচ্ছে হলে খোলে, নতুবা অধিকাংশ দিন বন্ধই থাকে। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টির অজুহাতে টানা কয়েকদিন এই ক্লিনিক পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

মাঝেমধ্যে খোলা থাকলেও সেবাগ্রহীতা কেউ আসলে ওষুধ সংকটের কথা বলে ফিরিয়ে দেয়া হয়। শনিবার একই উপজেলার কাকিয়াছড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে বন্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয় চা শ্রমিকরা জানান, ২টার কিছু সময় আগে বন্ধ করে তারা চলে গেছেন। সিন্দুরখান ইউনিয়নের সাইটুলা ক্লিনিকেও একই চিত্র মিলে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের সালন কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা গেছে তালাবদ্ধ। স্থানীয়রা জানান, ২টার আগেই তারা বন্ধ করে চলে গেছেন। নির্ধারিত সময়ে খোলা হয় না। আবার বেলা ৩টার আগেই কর্মরত সিএইচসিপি বন্ধ করে চলে যান। এসব অনিয়ম যেন হয়ে গেছে নিয়ম। একই উপজেলার অন্তেহরী কমিউনিটি ক্লিনিকেও একই চিত্র পাওয়া যায়।

গত রোববার কমলগঞ্জের মধ্যভাগ কমিউনিটি কিøনিকে সকাল সাড়ে ৯টায় বন্ধ পাওয়া গেছে। গত সোমবার জুড়ীর সাগরনাল কমিউিনিটি বেলা আড়াইটার দিকে কাউকে পাওয়া যায়নি। একই চিত্র জেলার বড়লেখা উপজেলারও। বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যে, অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি ঠিক সময়ে ক্লিনিকে আসেন না। ক্লিনিকগুলোর সপ্তাহে ৩-৪দিন খোলা থাকে। ঠিক সময়ে খোলা হয় না, নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী রোগীরা জানান, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা কমিউনিটি ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে। এক রোগীর ভাষায়, গরিব মানুষ হিসেবে বিনামূল্যে চিকিৎসার আশায় আসি, কিন্তু ওষুধ না থাকায় খালি হাতেই ফিরতে হয়।

রাজনগরের নিদনপুর গ্রামের বাসিন্দা ফাতিহা বেগম বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে আলসারের রোগী। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারি না। চার মাস ধরে ক্লিনিকে এসে কোনো ওষুধ পাইনি। সরকারি ক্লিনিক থেকেও যদি না পাই, তাহলে আমরা কোথায় যাবো?

স্থানীয় ইমাম আব্দুন নুর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে ওষুধের সংকট চলছে। আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এখানে আসে। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে গরিব মানুষ চরম বিপদে পড়বে। দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর বাসিন্দা রুজিনা বেগম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে কয়েক দিন গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছি। প্রয়োজনীয় কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। গত পরশু দিনও ক্লিনিকে এসেছি, কিন্তু কোনো ওষুধ পাইনি।

মৌলভীবাজার সদর শ্যামেরকোনা কমিনিউটি ক্লিনিক সিএইচসিপি, কর্মরত জান্নাত আরা বেগম বলেন, বর্তমানে আমাদের ক্লিনিকে ওষুধের তীব্র সংকট চলছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকলে রোগীরা উপকৃত হতেন এবং সদর হাসপাতালের চাপও কিছুটা কমতো। কিন্তু ওষুধ না থাকায়  রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করছেন।

মৌলভীবাজার জেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রুবেল আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধরেই ঔষধের সংকট চলছে কমিউনিটি ক্লিনিকে। আমরা বারবার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছি। আমাদের অফিস থেকেও ঢাকায় যোগাযোগ করা হয়েছে। আমাদেরকে বলা হচ্ছে শিগগির ওসুধ সংকট নিরসন হবে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৩১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সংকট চলছে। আমাদের উপজেলায় আগে তিন কার্টুন ওষুধ আসতো, এখন এক কার্টুন আসে। চাহিদা আনুযায়ী ওষুধ না পাওয়ায় রোগীরা ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রয়েছে নানা সমস্যা। টানা ভারী বৃষ্টিপাত হলেই উপজেলার লইয়ারকুল কমিউনিট ক্লিনিক পানিতে তলিয়ে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা থাকে। আমরা কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। আর দায়িত্ব অবহেলার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সরাসরি আমাদের অধিনে নয়। এটি কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট নিয়ন্ত্রণ করে। বাজেটগুলো সিএইচসিপিদের মাধ্যমে দেওয়া হয়।

এজন্য আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে কিছুটা কষ্ট হয়। আমরা কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের সাথে কথা বলেছি, তারা দ্রুত ওষুধ সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছেন। অনিয়ম-অবহেলার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করছি ওষুধ সংকট নিরসন হলে রোগীদের ভোগান্তি থাকবে না।

 

 

একুশে সংবাদ/ওজি

Link copied!