পেশাগত সাফল্য অনেককে শিকড় ভুলিয়ে দিলেও ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন পাবনার ফরিদপুরের সন্তান ডা. মনোয়ার মাহমুদ ভূইয়া পুলক। খ্যাতি ও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগোলেও তিনি ভুলে যাননি নিজের এলাকা ও সেখানকার মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
চিকিৎসা সেবায় মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন ডা. পুলক। মূল পেশার পাশাপাশি ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখার সময় তিনি শুরুতেই একটি শর্ত দিয়েছিলেন—সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের কম খরচে বা প্রয়োজনে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে কোনো বাধা দেওয়া যাবে না। মানবিক বিবেচনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা মেনে নেয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সেই শর্তেই সেখানে রোগী দেখছেন তিনি।
ডা. মনোয়ার মাহমুদ ভূইয়া পুলক বর্তমানে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে ইএনটি অ্যান্ড হেড-নেক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তার বাড়ি পাবনার ফরিদপুর উপজেলার জন্তিহার গ্রামে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আলহাজ মো. হামিদুল মাহমুদ ভূইয়া ও অবসরপ্রাপ্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা মোছা. মোমেনা খাতুনের জ্যেষ্ঠ সন্তান।
শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের সঙ্গে কালিয়াকৈর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সরকারি আকবর আলী কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। পরে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে দুই বছর মেয়াদি ডিএলও ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
চিকিৎসা পেশায় নিজের দক্ষতা বাড়াতে তিনি নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে এমসিপিএস এবং এফসিপিএসের প্রথম পর্ব সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে এফসিপিএসের দ্বিতীয় পর্বে অধ্যয়নরত রয়েছেন।
শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়া নয়, মানুষের সেবাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন এই তরুণ চিকিৎসক। তিনি বলেন, “বাবা-মায়ের নির্দেশনা ছিল—যেখানেই থাকো, যেভাবেই থাকো, এলাকার মানুষের সেবা করতে হবে।” সেই শিক্ষা তিনি আজও হৃদয়ে ধারণ করে চলেছেন।
ডা. পুলক আরও বলেন, “আমাদের দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরা সবচেয়ে অসহায়—সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে। আমি সাধারণ রোগীর পাশাপাশি এই রোগীদের নিয়েও বিশেষভাবে কাজ করতে চাই।” এ লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস থেকে হেড-নেক ক্যান্সার সার্জারিতে এমআরসিপি ও এফআরসিএস ডিগ্রি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। তবে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তার আন্তরিক আচরণ ও রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাবের কারণে তিনি রোগী ও সাধারণ মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। অনেক রোগীই জানান, ডা. পুলক ধৈর্য নিয়ে রোগীর কথা শোনেন এবং সহজ ভাষায় রোগ সম্পর্কে বুঝিয়ে দেন—যা তাদের আস্থা বাড়ায়।
শুধু চেম্বারেই সীমাবদ্ধ নন তিনি; সময় পেলেই গ্রামের বাড়িতে গিয়ে অলিগলিতে, এমনকি চায়ের দোকানেও বসে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা পরামর্শ দেন। সাধ্যমতো চেষ্টা করেন গরিব রোগীদের অর্থ ও ওষুধ দিয়ে সাহায্য করার।
ডা. পুলকের বিশ্বাস, একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না। তিনি বলেন, “নিজের জন্য বাঁচা জরুরি, তবে সবাইকে নিয়ে বাঁচতে পারলে আনন্দটা আরও বড় হয়।”
খ্যাতিমান চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও নিজের শিকড় ভুলে যেতে চান না তিনি। নিজের গ্রাম ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার এই অঙ্গীকারই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সেবামূলক মনোভাব অনেক তরুণ চিকিৎসকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

