চারদিকে দিগন্তবিস্তৃত সরিষা ফুলের হলুদ আভা। মাঝখানে একটি জমিতে সারি সারি করে রাখা কাঠের বাক্স। কাছে গেলেই ভেসে আসে মৌমাছির গুঞ্জন। হাজারো মৌমাছির কর্মব্যস্ততায় মুখর এই এলাকা—এ যেন মধুময় ফুলের রাজ্য। এটি একটি মৌমাছির খামার, যেখানে এককালীন সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের পর অতিরিক্ত বড় কোনো খরচ ছাড়াই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বিএল বাড়ি ইউনিয়নের এরশাদনগর হাটসংলগ্ন জমিতে স্থাপিত একটি অস্থায়ী খামারে কথা হয় মৌচাষি মো. সানোয়ার হোসেনের সঙ্গে। ৪৩ বছর বয়সী সানোয়ার হোসেন দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় নিজেকে একজন সফল মৌচাষি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০০১ সালে বিসিকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে মৌচাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে মাত্র ১০টি মৌ-কলোনি নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে তার কলোনির সংখ্যা প্রায় ৩৫০টি।
চলতি মৌসুমে তিনি ৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৫ হাজার কেজি মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তার বার্ষিক মোট উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার কেজি। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নিট লাভ হয় বলে জানান তিনি।
প্রতি সোমবার বগুড়ার আরডিএ হাটে তার উৎপাদিত মধু বিক্রি হয়। পাশাপাশি অনলাইনেও মধু বিক্রি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বড় কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরাসরি হাট থেকেই মধু সংগ্রহ করেন।
সানোয়ার হোসেন জানান, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং আরডিএ (RDA) থেকে মৌচাষে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় বক্স সরবরাহ করা হয়। আধুনিক প্লাস্টিক বক্সে মৌচাষ করলে মধুর উৎপাদন ও গুণগতমান উভয়ই বৃদ্ধি পায়। এসব বক্সে পরাগরেণু সংগ্রহেরও সুযোগ রয়েছে, যার বাজারমূল্য বেশ বেশি। তবে এসব আধুনিক বক্স অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকারি উদ্যোগে মৌচাষিদের মধ্যে এসব বক্স বিতরণ করা হলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়ত বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে সীমিতভাবে সরিষা চাষিদের এসব বক্স দেওয়া হলেও মৌচাষিদের জন্য তা বন্ধ রয়েছে, যা হতাশাজনক।
তিনি বলেন, “অনেক কৃষকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে—মৌমাছি সরিষার ফুল খেয়ে ফেলে। বাস্তবে মৌমাছি পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন বাড়ায়। কিন্তু অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি মারা যাচ্ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং মৌচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে কৃষি অফিসে অভিযোগ জানালেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।”
সানোয়ার হোসেন আরও বলেন, “কিছু সুবিধা-অসুবিধা থাকলেও উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য মৌচাষ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। নতুনরা অভিজ্ঞ মৌচাষিদের সঙ্গে হাতে-কলমে কাজ শিখলে সহজেই সফল হতে পারবে।”
অভিজ্ঞজনদের মতে, সরকারি সহায়তা ও সচেতনতা বাড়ানো গেলে মৌচাষ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

