বেতন ছাড়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, ৩ কর্মচারী চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদে মিটফোর্ড হাসপাতালে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বেতন দ্রুত ছাড় করিয়ে দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগ এবং পরে তিন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী কর্মচারীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত বেতন, প্রশাসনিক হয়রানি এবং চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে কর্মচারীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুর ১টার দিকে হাসপাতালের পরিচালক কার্যালয়ের সামনে অর্ধশতাধিক কর্মচারী মানববন্ধনে অংশ নেন। পরে তারা পরিচালক বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মচারীরা জানান, সম্প্রতি পরিচালক কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠির মাধ্যমে প্যাথলজি বিভাগের কর্মী মো. ফজলুর রহমান, অফিস সহায়ক মো. আলাল হোসেন এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. বিল্লাল মজুমদারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালের প্রায় ১২০ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কখনো দুই থেকে তিন মাস, আবার কখনো পাঁচ-ছয় মাস পর্যন্ত বেতন আটকে রাখা হয়। বেতন দ্রুত ছাড় করিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অতিরিক্ত খরচের কথা বলে হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো. জাহিদুর রহিম কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
চাকরিচ্যুত কর্মচারী বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল, ডিডি অফিস ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাস করাতে খরচ হয়। সে কারণে কর্মচারীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে সংগ্রহ করা হয়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজও আমাদের কাছে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে দ্রুত বেতন পাওয়ার আশায় কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। পরে সেই বিষয়টি মেসেঞ্জার গ্রুপে আলোচনা হলে একটি স্ক্রিনশট প্রশাসনের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর তাদের ডেকে পাঠানো হয়।
বিল্লাল হোসেনের ভাষ্যমতে, “আমাদের বলা হয়েছিল, কোনো সমস্যা হবে না। টাকা দেওয়ার পর আইডি কার্ড দিয়ে কাজে যোগদানের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সকালে আইডি কার্ড না দিয়ে উল্টো আমাদের হাতে চাকরিচ্যুতির চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা চাকরি ফেরত চাই এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।”
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের কর্মচারী মোঃ আলী হোসেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তারা অনিয়মিত বেতনের সমস্যায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, “বেতন চাইতে গেলে আমাদের বলা হতো, কিছু ‘সহযোগিতা’ করলে বেতন দ্রুত দেওয়া হবে। প্রথমে ৫০০ টাকা করে চাওয়া হয়েছিল। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে ২০০ টাকা করে দেওয়া শুরু করি। আমাদের অনেকের কাছেই এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরিতে কাজ করলেও তাদের দিয়ে মাসে ৩০ দিন কাজ করানো হয়, অথচ বেতন দেওয়া হয় ২৬ দিনের। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলেই চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হতো বলেও দাবি করেন তিনি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মচারীরা বলেন, তারা কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন। দীর্ঘদিনের বেতন জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় এবং দ্রুত বেতন পাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু সেই ঘটনাকেই ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে উল্লেখ করে কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরিচালক বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে কর্মচারীরা উল্লেখ করেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে আসছেন। অধিকাংশ কর্মচারীই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে অনিয়মিত বেতনের কারণে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, বেতন দ্রুত ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাউন্টস কর্মকর্তা জাহিদুর রহিমের সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি বিভিন্ন দাপ্তরিক খরচের বিষয় উল্লেখ করেন। পরে কর্মচারীরা সরল বিশ্বাসে এবং দ্রুত বেতন পাওয়ার আশায় নিজেদের মধ্যে অর্থ সংগ্রহ করেন। তবে তাদের উদ্দেশ্য কোনো অনিয়ম করা বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা ছিল না বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কর্মচারীরা মানবিক বিবেচনায় চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত বাতিল করে পুনর্বহালের দাবি জানান। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা। এ সময় কর্মচারীরা আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, দ্রুত তাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। পাশাপাশি বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আনার আহ্বানও জানান।
একুশে সংবাদ/রাফি/বাবু



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

