বিকেল থেকেই ছিল ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আভাস, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস। আমরা তখন ঢাকার ব্যস্ত সড়কে হাঁটছি না, ছুটছি গাড়িতে। গাড়ির ভেতরে বাজছিল আষাঢ়ের গান-‘চলো কোথাও যাই, এই ঝড়-বর্ষায়...’।
গানটির আবেশে হঠাৎ মনে হলো, শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে প্রকৃতির কাছাকাছি না গেলে যেন বর্ষার আসল সৌন্দর্য উপভোগ করা হবে না।
সঙ্গে থাকা সবার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক হলো, বর্ষার টাঙ্গুয়ার হাওরই হতে পারে প্রকৃতির সেই নির্মল রূপ দেখার সেরা ঠিকানা। কথার মাঝেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত-সব ব্যস্ততা সরিয়ে এবার গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওর।
সেদিন রাতেই বিলাসবহুল হাউসবোট ‘ক্যানভাস’-এ দুটি কক্ষ বুক করে পরদিন সকালে রওনা হলাম সুনামগঞ্জের উদ্দেশে।
রাতটি কাটালাম সুনামগঞ্জ শহরের একটি হোটেলে। পরদিন ১৬ আষাঢ় সকালে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার ঘাটে পৌঁছাতেই চোখে পড়ল সারি সারি কাঠ ও স্টিলের তৈরি হাউসবোট। মনে হলো, প্রতিটি নৌযানই যেন অতিথিদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হয়ে আছে।
নির্ধারিত হাউসবোটে পা রাখতেই অনুভূতি হলো, যেন কোনো বিলাসবহুল ক্রুজে উঠেছি। পরিচ্ছন্ন কক্ষ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং আন্তরিক আতিথেয়তা মুগ্ধ করল। সকালের নাশতা শেষে হাউসবোট যখন হাওরের বুকে এগিয়ে চলল, তখন দেখা গেল একের পর এক নৌযান একই গন্তব্যের পথে ছুটছে।
তবে যাত্রার শুরুতেই ঘটে ছোট্ট এক বিপত্তি। হাউসবোটটি একটি চরে আটকে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও আড্ডা, হাসি, ছবি তোলা আর গল্পে সেই সময়টুকুও হয়ে ওঠে উপভোগ্য। প্রকৃতির পথে এমন ছোটখাটো বাধাও যেন ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ওয়াচ টাওয়ারে হাওরের প্রথম স্পর্শ
চর থেকে মুক্ত হওয়ার পর আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান ওয়াচ টাওয়ার। বলাই নদীর তীরে হিজল বনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই টাওয়ার থেকে দেখা যায় হাওরের বিশাল জলরাশি ও প্রকৃতির অপরূপ বিস্তার।
পরে একটি ছোট নৌকা ভাড়া করে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বের হলাম। নৌকা ভাসতে ভাসতে কিশোর মাঝির কণ্ঠে ভেসে এলো হাওরের লোকগান। তার সুরে যেন বর্ষার আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
এরপর স্বচ্ছ পানিতে নেমে চলল ঘণ্টাখানেকের আনন্দময় স্নান। পানিতে নেমে উচ্ছ্বাস আর দুষ্টুমির একপর্যায়ে দলের একজনের চশমা হারিয়ে গেল। শুরু হলো সেটি খুঁজে বের করার নতুন অভিযান।
বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে চশমাটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ছোট্ট এই ঘটনাই চারজনের দলটিতে যোগ করে বাড়তি হাসি আর আনন্দের মুহূর্ত।
সবশেষে দুপুরের খাবারের জন্য আবার হাউসবোটের দিকে রওনা হলাম। হাওরের বুকে ভেসে চলার সেই পথটুকুও ছিল প্রকৃতির সঙ্গে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
বিকেলের নীলাদ্রি ও লাকমা ছড়ায়
বিকেলে পৌঁছালাম টেকেরঘাট। এটি সীমান্তঘেঁষা গ্রাম। সেখানে বোট বেঁধে আমরা নামলাম নীলাদ্রি লেক বা শহীদ সিরাজ লেকের তীরে। স্থানীয়দের কাছে পাথর কোয়ারি নামে পরিচিত এই লেকের স্বচ্ছ নীল পানি, মেঘালয়ের পাহাড় আর সবুজ টিলার মেলবন্ধন জায়গাটি সত্যিই অপূর্ব।
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় নীলাদ্রি যেন অন্য এক রূপে ধরা দিল। ওখানে থেকে মোটরবাইক ভাড়া নিয়ে চলে গেলাম লাকমা ছড়ায়। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা শীতল পানির ছোঁয়া মুহূর্তেই দূর করে দিল সব ক্লান্তি।
তবে পাহাড়গুলো আমরা ছুঁতে পারি না বলে আফসোসের শেষ নেই। সব পাহাড় পড়েছে সীমান্তের ওপারে। এ ছাড়া লাকমা ছড়ায় যে পাথর রয়েছে, সব নিয়ে গেছে স্থানীয়রা। শুধু ধু-ধু বালুকণা।
এদিকে বোট থেকে থেকে নেমে হেঁটেও ঘুরে আসতে পারবেন লাকমা ছড়া। ঘাট থেকে সেখানে হেঁটে যেতে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগবে। স্থানীয় যে কাউকে বললে পথ দেখিয়ে দেবে। এরপর মোটরসাইকেলে গ্রাম ঘুরে দেখে সন্ধ্যায় গেলাম ইন্ডিয়ান মার্কেটে। সেখানে ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়।
বৃষ্টিভেজা রাতের উৎসব
সন্ধ্যায় ফিরে এলাম হাউসবোটে। রাত গভীর হতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বাইরে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, বিদ্যুতের ঝলকানি আর হাওরের নীরবতা-সব মিলিয়ে এক মোহময় পরিবেশ।
কিন্তু সেই বৃষ্টি আমাদের আনন্দ থামাতে পারেনি। হাউসবোটে থাকা বিভিন্ন জেলার পর্যটকেরা একসঙ্গে বসে জমিয়ে তুললেন গান, নাচ আর আড্ডার আসর।
কেউ গাইলেন ভাটিয়ালি, কেউ আধুনিক গান, আবার কেউ নাচে যোগ দিলেন। অচেনা মানুষগুলো মুহূর্তেই হয়ে উঠলেন আপনজন। বর্ষার সেই রাত টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকেই হয়ে রইল আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি।
পাহাড়, নদী আর ছড়ার দেশে
পরদিন ঝুম বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হলো নতুন দিনের ভ্রমণ। টেকেরঘাট থেকে চলে গেলাম জাদুকাটা নদীতে। স্বচ্ছ পানির এ নদীটির এক পাশে মেঘালয় পাহাড়, অন্য পাশে সবুজ প্রকৃতি।
মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজেই এক জলরঙের ছবি এঁকেছে। সঙ্গে ঘুরে দেখলাম দেশের অন্যতম বৃহৎ শিমুল বাগান। যদিও বর্ষাকালে ফুল ছিল না, তবু সবুজে মোড়া পরিবেশ আর পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন ছুঁয়ে গেল।
ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে দেখা যায় পুরো বাগান। অন্য পাশে বারিক্কা টিলা। টিলার ওপর দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দেখা যায় পাহাড়, নদী আর হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শুধু প্রকৃতিকে অনুভব করলাম।
দুপুরের পরে খাবার খেয়ে রওনা দিয়ে বিকেলে ফিরে এলাম আনোয়ার ঘাটে। শেষ হলো দুই দিনের ভ্রমণ। কিন্তু আষাঢ়ের বৃষ্টি, টাঙ্গুয়ার হাওরের জল, মেঘালয়ের পাহাড়, জাদুকাটা নদী আর হাউসবোটের সেই বৃষ্টিভেজা রাত আজও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য বর্ষার চেয়ে সুন্দর সময় আর হয় না। একবার গেলে ফিরে আসবেন ঠিকই, কিন্তু মন রয়ে যাবে হাওরের অসীম জলরাশিতেই।
কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে যেতে হবে সুনামগঞ্জ। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। এ ছাড়া ট্রেনে সিলেট গিয়ে সেখান থেকে বাস বা মাইক্রোবাসে সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়।
সুনামগঞ্জ শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা বা রিজার্ভ গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টায় তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার ঘাট যাওয়া যায়। সেখান থেকে হাউসবোট বা ট্রলারে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ শুরু হয়।
কোথায় থাকবেন
টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের জনপ্রিয় ব্যবস্থা হলো হাউসবোটে রাত্রিযাপন। বিভিন্ন মান ও বাজেটের হাউসবোট পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই আগে বুকিং করে রাখবেন।
অনলাইনে খুঁজলে পাওয়া যাবে প্রায় সব হাউসবোটের পেজ। সেখানে যোগাযোগ করে নেওয়া যাবে। চাইলে স্পিডবোট নিয়ে সারা দিন ঘুরে সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলেও রাত কাটাতে পারেন।
কী খাবেন
হাউসবোটে সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকে। হাওরের টাটকা মাছ, দেশি মুরগি, ডাল, ভর্তা, সবজি এবং বারবিকিউ ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। আগে থেকেই খাবারের মেনু ঠিক করে নেওয়া ভালো।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

