টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেই মারা গেছেন ১৬ জন। এছাড়া কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও পেকুয়ায় পৃথক দুর্ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিতে জেলার পাহাড়ঘেঁষা এলাকাগুলোতে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর একটি নুরানী ও হেফজখানায়। টানা বর্ষণে দুর্বল হয়ে পড়া পাহাড়ের ঢাল ধসে মাদরাসার ওপর পড়ে। এতে বহু শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশাসনের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, দুর্ঘটনার সময় মাদরাসায় প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। ভারী বৃষ্টি ও কাদামাটির কারণে উদ্ধারকাজে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলেও স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযান চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের ওপর নির্মিত একটি স্থাপনার দেয়াল ও মাটি ধসে নিচের হেফজখানার ওপর পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা চাপা পড়ে।
এর আগে সোমবার রাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছিল। সর্বশেষ ঘটনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।
এদিকে একই সময়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা, দরিয়ানগর, উখিয়া এবং পেকুয়ায় পৃথক পাহাড়ধসে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত জেলায় ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জেলার সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমও চালু রয়েছে।
প্রশাসন, উদ্ধারকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন মানবিক সংগঠন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে কাজ করছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

