সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং তার পরবর্তীতে সকল সারির গণমাধ্যমগুলোতে এক বয়স্ক নারীর ছিঁলা-ফোলা চেহারা ভেসে আসছে। অনেকটা বিনা পারিশ্রমিকে বা হয়তো সামান্য পারিশ্রমিকে দুই যুগেরও বেশি সময় যাবত এক রেলওয়ে স্টেশন কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখার দায়িত্ব পালনকারী ওই নারীর ছিল না কোন পরিবার-পরিজন; ছিল না কোন ভালো লাগা-খারাপ লাগা, অন্তত প্রকাশ ছিল না! থাকবে কি করে, তিনি তো কানে শুনতেন না আর সঙ্গত কারণে বলতেও পারতেন না!
ওই পৌঢ়ার নাম জানা যাচ্ছে `বুবি`। নামটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেমন যেন বেমানান, তাই না? বেমানান হবে না কেন, নাম টি তো তার পরিবারের দেওয়া নয়। সহজে অনুমেয়, নামটি দেয়া হয়েছিল কথা বলতে না পারার বৈশিষ্ট্যকে ভিত্তি করে। `বোবা` থেকে `বুবি`!
আচ্ছা, অনেক ছোটবেলায় বাবা তার কথা বলতে না পারা রাজকন্যার জন্য কোন নাম রেখেছিলেন? কি নামে মা ডাকতো তাকে? আমরা জানতে পারিনি; জানবো কি করে, উনিতো `বুবি`, কলমও নিশ্চয়ই ধরতে পারতেন না!
কয়েক যুগ পূর্বে পরিবার থেকে যখন বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তখন পরিবারে ফেরার আকুতি ছিল কি তার? হয়তো ছিল! আমরা জানতে পারিনি। বাবা কি তার রাজকন্যাকে খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন? হয়তো করেছিলেন! আমরা জানতে পারিনি।
সামান্য অনুদান আর সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া জমানো কিছু টাকা কেড়ে নিতে গিয়ে তাকে ছিঁলা-ফোলা জখম করা হয়েছিল। এই ঘটনায় তার কেমন লেগেছিল? আমরা জানতে পারিনি। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই মারা গেলেন তিনি। `বুবি` কতখানি অভিমান আর কষ্ট নিয়ে পৃথিবী ছাড়লেন? আমরা জানতে পারিনি।
তবে আমরা যা জানতে পেরেছি তা হলো, `বুবি`কে মেরে ফেললো এই সমাজেরই কজন মানুষ; সেই সমাজের, পরিবারকে হারিয়ে যে সমাজকে তিনি পরিবার করে বেঁচে ছিলেন এতদিন! আমরা আরো জানতে পেরেছি, `বুবি` একটি স্টেশন কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে পারলেও আমরা সমাজকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করতে পারিনি!
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

