চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলা এখন যেন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। উপজেলা সদর থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রান্তে মাদকসেবী ও চোরচক্রের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
নেশার টাকা জোগাতে অপরাধের পথ বেছে নিচ্ছে এলাকার তরুণ ও যুবকরা, যার ফলে চুরি, ছিনতাই এবং সামাজিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে।
মাদকের সহজলভ্যতা এখন উপজেলাবাসীর জন্য এক মরণফাঁদ। বিশেষ করে উপজেলার কাছিয়ায়াড়া, কলেজগেট এলাকা, পূর্ব বড়ালী, গাব্দেরগাঁও, পাউতলী, শাশীয়ালী গাজীপুর বাজার এলাকাসহ ৭নং পাইকপাড়া উওর ইউনিয়ন গ্রামের অলিগলি যেন মাদকের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
এখান থেকেই প্রতিদিন মাদকের চালান ছড়িয়ে পড়ছে পুরো উপজেলায়। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মাদকের মরণনেশায় আক্রান্ত হয়ে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে, যা পুরো সমাজ ও অভিভাবকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এসব অপরাধ নির্মূলে রাজনীতিবিদ, এলাকার সুশীল সমাজ ও প্রশাসনের কর্তাদের সচেষ্ট হওয়া জরুরি।
বেশ কয়েকজন অভিভাবক বলেন, তাদের সন্তানরা মাদকের সাথে জড়িয়ে পথ হারা হয়ে শিক্ষা জীবন ছেড়ে দিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও মাদক থেকে ফেরানো
যায়নি তাদেরকে। ভুক্তভোগী অভিভাবকদের দাবী মাদকের গডফাদার যারা, তাদেরকে আইনের আওতায় আনলে সমাজ থেকে মাদক দূর করা সম্ভব।
কিন্তু ভয়াবহ বিষয় হলো, প্রভাবশালী চক্র এবং অনেক সাবেক জনপ্রতিনিধি নিজেরাই নিজ বাড়িতে মাদক সেবনের নিরাপদ আসর বসিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই সাধারণ মানুষ পাল্টা মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছেন। মামলাকে তারা এখন নিজেদের রক্ষা কবচ ও হয়রানির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের জন্য অনেকেই প্রশাসনের দুর্বল ও লোক দেখানো অভিযানকে দায়ী করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত অভিযানের নামে কেবল ছোটখাটো মাদকসেবীদের আটক করা হলেও মূল গডফাদাররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। ফলে মাদক ব্যবসাও বন্ধ হচ্ছে না, বরং এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলার গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান পাটওয়ারী এবং গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ বলেন, “আমরা নিয়মিত প্রশাসনকে মাদকের তথ্যাদি দিচ্ছি। মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করাই এখন সময়ের দাবি।”
ফরিদগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানান, “মাদক নির্মূলে আমাদের পুলিশি অভিযান প্রতিনিয়ত চলছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে আমরা কিছু সফল অভিযানও চালিয়েছি। এলাকাবাসী যদি সুনির্দিষ্ট ও সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন, তবে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের জন্য সহজ হয়।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, “আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি নিয়মিত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। আমরা মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আপসহীন এবং ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। তবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি মাদক কারবারিদের পরিবার ও এলাকাবাসীসহ সবার সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত সময়ের মধ্যে মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ছোটখাটো মাদক কারবারিসহ নেপথ্যে থাকা বড় সিন্ডিকেট বা গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। অন্যথায় বর্তমান প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম এক ঘোর অন্ধকারে হারিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

