সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও কার্যকর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্ব পালনকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটের মধ্যে ছিল। ফলে নতুন সংস্কার শুরুর চেয়ে ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্থিতিশীল করাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার (১৫ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) ৫৮তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিবিএ, এমবিএ, ইএমবিএ ও ডিবিএ প্রোগ্রামের মোট ৩৬৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেকে জানতে চান স্বল্প সময়ে সরকার কী অর্জন করেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যা অল্প সময়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, অর্থনীতির অবস্থা এমন ছিল যে প্রথমে সেটিকে “খাদের কিনারা” থেকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ছিল মূলত দুই ধাপে—প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থাকে মেরামত করা, পরে সংস্কারের পথে এগোনো। “রিপেয়ার” এবং “রিফর্ম”—এই দুটি শব্দ দিয়েই তিনি সেই সময়ের কার্যক্রম ব্যাখ্যা করেন।
সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টার মতে, রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের অভাব ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। ফলে অনেক সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব প্রশাসনসহ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গিয়েছিল এবং লেনদেন ভারসাম্য নেতিবাচক অবস্থায় ছিল। যদিও বর্তমানে কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা ফিরেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল আইনব্যবস্থার কারণে খাতটি সংকটে পড়েছে। শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন আইনি সংস্কার। তিনি মন্তব্য করেন, দুর্বল আইন রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
এছাড়া কয়েকটি ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়টিও কঠিন উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে আগের তুলনায় দ্রুত অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সুশাসনের অভাব শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি খাতেও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, জবাবদিহির দুর্বল সংস্কৃতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয়ের অপচয় বাড়ছে। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের বহু বছর পরও শেষ হচ্ছে না।
জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। ফলে শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে রপ্তানি খাতেও দীর্ঘদিন প্রণোদনা দেওয়ার পরও অনেক শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শুল্ক ব্যবস্থার প্রভাব মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখনও অনেক বলে মনে করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সুশাসন, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দেশও দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
সমাবর্তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে নতুন প্রজন্মকে শুধু দক্ষ নয়, নৈতিক নেতৃত্বও দিতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের সততা, মানবিকতা ও পেশাগত উৎকর্ষ ধরে রেখে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আইবিএর পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন। এ বছর বিভিন্ন প্রোগ্রামে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ২৬ জন শিক্ষার্থী ডিরেক্টরস অনার লিস্টে স্থান পান এবং দুজন শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক অর্জন করেন।
একুশে সংবাদ/যাবিদ



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

