ঢাকা শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি : এশিয়ায় বাংলাদেশ পঞ্চম ও বিশ্বে ২২তম


Ekushey Sangbad
একুশে সংবাদ ডেস্ক
০৪:২৯ পিএম, ৫ জুলাই, ২০২১
সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি : এশিয়ায় বাংলাদেশ পঞ্চম ও বিশ্বে ২২তম

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির সূচকে এশিয়া মহাদেশে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে এখন বাংলাদেশ। বর্তমানে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ভারত, নেপাল এবং পাকিস্তানের চেয়ে বেশি বাংলাদেশের। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশনের (সিআরআইডিএ) বিশ্লেষণে এই সব তথ্য উঠে এসেছে।

সোমবার (৫ জুলাই) প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শাহরিয়ার রোজেন এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

সিআরআইডিএ জানায়, ১ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির সূচক বা রিপ্রোডাকশন রেট হচ্ছে ১.৪১- অর্থাৎ সংক্রমণ প্রতি ১০০০ জন থেকে ১৪১০ জনে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের উচ্চ রিপ্রোডাকশন রেট ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশ এখনও সংক্রমণের চূড়ায় পৌঁছায়নি। কিন্তু জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণের মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে লকডাউন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সংক্রমণ ২-৩ সপ্তাহ পর স্থিতিশীল হয়ে আসতে পারেও বলে জানান। 

সংক্রমণ কত দ্রুত বাড়ছে তা নির্ণয় করার জন্য সারা বিশ্বে “রিপ্রোডাকশন রেট” নামক সূচক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটার তথ্য ব্যবহার করে সিআরআইডিএ’র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সর্বশেষ (১ জুলাই, ২০২১) রিপ্রোডাকশন রেট হচ্ছে ১.৪১, যা বাংলাদেশে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট শনাক্তের প্রথম দিন (অর্থাৎ ৮ মে, ২০২১)-এর তুলনায় ২০০ শতাংশেরও বেশি বলে দেখা যাচ্ছে। 

রিপ্রোডাকশন রেট দিয়ে বোঝায়, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে কত জন মানুষ নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছে। রিপ্রোডাকশন রেট ১.০০’র বেশি হলে বুঝতে হবে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আর রিপ্রোডাকশন রেট যদি ১.০০’র কম হয়, তবে বোঝা যায় সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ রিপ্রোডাকশন রেট ১.৪১’র অর্থ হলো প্রতি ১০০০ জন থেকে সংক্রমণ ১৪১০ জনে ছড়িয়ে পড়ছে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ভারত, নেপাল এবং পাকিস্তানের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। আফ্রিকান দেশ বাদ দিলে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম। সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির সূচকে বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২২তম এবং এশিয়ায় পঞ্চম।

ডা. শাহরিয়ার রোজেন জানান, রিপ্রোডাকশন রেট সংক্রামক ব্যাধির সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লকডাউনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এই রিপ্রোডাকশন রেট বিবেচনা করেই। গত ৫ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য যখন তাদের মহামারির দ্বিতীয় ঢেউকে দমন করতে দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন ঘোষণা করতে বাধ্য হলো, তখন দেশটিতে রিপ্রোডাকশন রেট ছিল ১.২১, যা আমরা বাংলাদেশ দেখেছে জুনের ৬ তারিখে । ৮ এপ্রিল যখন উচ্চ সংক্রমণের জন্য কানাডার অন্টারিও প্রদেশে লকডাউন এবং ঘরবন্দির আদেশ জারি করা হয় তখন রিপ্রোডাকশন রেট ছিল ১.২। এই তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কতটা আকাশচুম্বী এবং ভয়াবহর দিকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেকদিন পর্যন্ত সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য এই সূচকটি ব্যবহার করা হয়নি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ রিপোর্টে এই সূচকটি ব্যবহার করা হয়েছে।

জুনের ২১-২৭ তারিখের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের ৬০টি জেলায় সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী (রিপ্রোডাকশন রেট ১.০০’র বেশি) এবং কেবল লালমনিরহাট, নওগাঁ, রাজশাহী ও সাতক্ষীরা জেলায় সংক্রমণের গতি নিম্নমুখী (রিপ্রোডাকশন রেট ১’র কম)।

কিছুদিন আগের কয়েকটি রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ জেলার সংক্রমণের বর্তমান অবস্থা খুব ভয়াবহ (অধিকাংশ জেলা অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ)। পাশাপাশি, এই নতুন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, ভবিষ্যৎ আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উচ্চ রিপ্রোডাকশন রেট ইঙ্গিত করে যে, আগামীতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে দেশে।

সিআরআইডিএ’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সংক্রমণের এই ভয়াবহতার কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে মানুষের অনীহা এবং দ্বিতীয়ত অধিক সংক্রমণক্ষম ডেল্টা ভেরিয়েন্টের প্রভাব।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডেল্টা ভেরিয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সকল সংক্রমণই (৯৯ শতাংশ) হচ্ছে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট দিয়েই। ১লা জুলাই যুক্তরাজ্যে ডেল্টা ভেরিয়েন্টের প্রভাবে ২৭ হাজার ৬৪৬ জন আক্রান্ত হয়েছে; জানুয়ারির পর এটাই সর্বোচ্চ সংক্রমণ। ডেল্টা ভেরিয়েন্টের প্রভাবে রাশিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ আবার বেড়ে চলেছে। আফ্রিকাতে ডেল্টা ভেরিয়েন্টের দ্বারা আশংকাজনকভাবে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেল্টা ভেরিয়েন্টের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ৭টি প্রধান শহরে লকডাউন দেওয়া হয়েছে।  

সিআরআইডিএ জানায়, কেবলমাত্র সরকারি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্ব এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে হলে জনসাধারণকে দুটি নিয়ম অবশ্যই মেনে চলতে হবে। প্রথমত, সঠিক নিয়মে মাস্ক পরতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। দ্বিতীয়ত, সকল ধরনের জনসমাগম পরিহার করতে হবে। সার্জিকাল মাস্ক সকল ধরনের ভেরিয়েন্টের বিপক্ষে সুরক্ষা প্রদান করে। গ্রামাঞ্চলে সার্জিকাল মাস্ক পাওয়া না গেলে তিন স্তরের কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৬ ভাগ জনগোষ্ঠী ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই বলে জানান সিআরআইডিএ। 

সেন্টার ফর রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশনের বিশ্লেষণ ও লেখচিত্র প্রস্তুত করেছেন সেন্টার ফর রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশনের এপিডেমিওলজি বিভাগের ডা. কেএম তৌহিদুর রহমান, ডা. শাহরিয়ার রোজেন, ডা. আয়শা আকতার এবং ডা. নাজিফ মাহবুব।

 

 

একুশে সংবাদ/রাফি/ব