ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তীব্র তাপপ্রবাহ, শুষ্ক আবহাওয়া ও প্রবল বাতাসের কারণে ফ্রান্স ও স্পেনে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিখ্যাত আঙুরক্ষেত্রবেষ্টিত ঐতিহাসিক শহর বর্দোর দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত আগুন। পরিস্থিতির কারণে দুই দেশ মিলিয়ে ইতোমধ্যে সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) বর্দোর মেয়র তোমা কাজনাভ জানান, দাবানল বর্তমানে শহরের প্রবেশমুখ থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার এবং কেন্দ্রস্থল থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। যদিও আপাতত পুরো শহর খালি করার কোনো পরিকল্পনা নেই, তবু পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শনিবার রাতে জিরোন্দ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম থেকে প্রায় ৫৫ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকেই এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিকে ফ্রান্সের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বনভূমির অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে দেশটিতে প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু গত এক সপ্তাহেই আগুনে পুড়েছে ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে জিরোন্দ অঞ্চলে প্রায় আড়াই হাজার অগ্নিনির্বাপক কর্মী, সুইজারল্যান্ডের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল, দেড় হাজার সেনাসদস্য এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য কাজ করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকরাও পানিবাহী ট্রাক নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
উদ্ধার অভিযানের অন্যতম অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নিকোলাস ব্রাজ জানান, দাবানল এতটাই তীব্র যে এটি নিজস্ব বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি করছে, যার ফলে ঘূর্ণিবায়ুর মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে বাতাসের গতিপথ হঠাৎ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে স্পেনমুখী একটি গুরুত্বপূর্ণ মোটরওয়ের প্রায় ৬০ কিলোমিটার অংশ বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, দাবানল মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পুনর্বিন্যাস করায় প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘ট্যুর ডি ফ্রান্স’-এর শেষ ধাপের রেস ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্যদিকে, স্পেনেও দাবানল পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে ৯০ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শনিবারে মাদ্রিদের পশ্চিমে ও ভালেনসিয়া অঞ্চলে নতুন করে আগুনের লেপন দেখা দিয়েছে।
ভালেন্সিয়া অঞ্চলে আগুনের কবলে পড়ে এক বয়স্ক বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে ফ্রান্সে আগুন নেভাতে গিয়ে দুই ফরাসি অগ্নিনির্বাপক কর্মী প্রাণ হারান।
মাদ্রিদ অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান ইসাবেল দিয়াজ আইউসো এটিকে অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বলে বর্ণনা করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে জলবায়ু জরুরি অবস্থার মোকাবিলায় বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় ঐক্যের আহ্বান জানান এবং সামনের সময়গুলো বেশ কঠিন হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, আকুইতেন অঞ্চলে জুলাই মাসের গড় তাপমাত্রা ছিল ৩২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই তীব্র তাপদাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সহসাই আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার আশা দেখা যাচ্ছে না। তথসূত্র: বিবিসি-রয়টার্স
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

