মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভারতের বিরুদ্ধে। দিল্লি থেকে আটক হওয়া অন্তত ৪০ জন রোহিঙ্গা দাবি করেছেন, তাদের জোরপূর্বক বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে আন্দামান সাগরে নামতে বাধ্য করা হয়।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, এই ঘটনায় রোহিঙ্গারা বর্তমানে আবারও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘও জানিয়েছে, ভারত তাদের জীবনকে ‘চরম ঝুঁকির মধ্যে’ ঠেলে দিয়েছে।
রোহিঙ্গা যুবক নুরুল আমিন জানান, গত মে মাসে তার ভাই খাইরুলসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে ভারত থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। সেনা অভ্যুত্থরের পর দেশটিতে চলমান ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের কারণে স্বজনদের আর খুঁজে পাওয়ার আশা নেই বলে জানান তিনি।
বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, আটক রোহিঙ্গাদের বিমানে আন্দামান দ্বীপে পাঠানো হয়, পরে বাসে করে নৌবাহিনীর জাহাজে তোলা হয়। কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধজাহাজে রাখার পর তাদের ছোট নৌকায় বসিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। যদিও প্রত্যেককে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল, তবু প্রাণ বাঁচাতে সাঁতরে তীরে উঠতে হয় তাদের।
রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, নৌবাহিনীর জাহাজে তোলার সময় তাদের হাত-পা বেঁধে চোখ-মুখ ঢেকে রাখা হয়েছিল। অনেককে মারধর করা হয়, অপমানজনক প্রশ্নও করা হয়। এমনকি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের ধর্মান্তর নিয়ে কটূক্তি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সৈয়দ নূর নামের এক শরণার্থী বলেন, “আমাদের সঙ্গে বন্দির মতো আচরণ করা হয়েছে। কেউ কেউ বারবার প্রহারও পেয়েছেন।”
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক টমাস অ্যান্ড্রুজ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তার হাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ রয়েছে, যা ইতোমধ্যে জেনেভায় ভারতের মিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বর্তমানে ভারতে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ রোহিঙ্গা জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় নিবন্ধিত হলেও প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি বলে মনে করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ভারত সরকার তাদের শরণার্থী হিসেবে নয়, বরং ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
ঘটনার পর নুরুল আমিনসহ কয়েকজন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন, যাতে রোহিঙ্গাদের নির্বাসনে পাঠানোর কার্যক্রম বন্ধ হয় এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তবে আদালতের একজন বিচারপতি এসব অভিযোগকে “অবাস্তব কল্পনা” বলে মন্তব্য করেন। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় থাকা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। নুরুল আমিন বলেন, “প্রতিদিন ভয় হয়, সরকার যেকোনো সময় আমাদেরও ধরে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে।”
একুশে সংবাদ/ঢ.প/এ.জে