ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং উজান থেকে নেমে আসা পানিতে মৌলভীবাজার জেলার চার উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার অন্তত ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার এবং ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা, যেখানে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার, ওষুধ ও গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অনেক স্থানে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
শনিবার সরেজমিনে রাজনগরসহ বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চারটি উপজেলার ৪ হাজার ১৭৫টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। দুর্গতদের জন্য জেলার বিভিন্ন স্থানে ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ১ হাজার ৭৫০ ব্যাগ শুকনো ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাজনগরে ২১০ ব্যাগ, কমলগঞ্জে ২৩৫ ব্যাগ, মৌলভীবাজার সদরে ৩১৩ ব্যাগ, কুলাউড়ায় ৩৪০ ব্যাগ, শ্রীমঙ্গলে ২৩৫ ব্যাগ, বড়লেখায় ২৬০ ব্যাগ এবং জুড়ীতে ১৫৭ ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ত্রাণ হিসেবে কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন করে এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে ত্রাণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলা রাজনগরের চেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে, যা বন্যাকবলিত মানুষের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ। এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, বন্যার মধ্যে রাজনগর উপজেলায় শুক্রবার দুটি ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে নিখোঁজ ৬৫ বছর বয়সী আশরাফ আলীর মরদেহ স্বজনরা উদ্ধার করেন। একই দিন একামধু এলাকা থেকে অর্ধগলিত অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের হিরামতি এলাকার কৃষক মাসুক মিয়া (৪৫) শনিবার সকালে গরুর জন্য ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে ধলাই নদীতে তলিয়ে নিখোঁজ হন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালালেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কমলগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে এবং বিশেষ ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, গতকালের তুলনায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের আরও চার থেকে পাঁচটি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, বন্যার্তদের জন্য ইতোমধ্যে শুকনো খাবার ও চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী, জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমানসহ বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

