বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই একদিকে আকস্মিক বন্যা, অন্যদিকে তীব্র নদীভাঙনের দ্বিমুখী আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলার প্রধান পাঁচটি নদী—ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও কালজানীতে একযোগে শুরু হওয়া ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও গাছপালা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে জেলার পাঁচ শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৩৬টি পয়েন্টে মোট ১১ দশমিক ২৪৫ কিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে তীব্র ভাঙন চলছে। ভাঙনের আতঙ্কে নদীপাড়ের বাসিন্দারা রাত জেগে ঘরবাড়ি পাহারা দিচ্ছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙনের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ।
দুধকুমার নদী: নদীটির পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতের কারণে সদর উপজেলার খাড়ুয়ারপাড় ও বানিয়াপাড়া এবং নাগেশ্বরী উপজেলার বেপারীর চর, সাপখাওয়া, মাঝিপাড়া, কুটিরচর, মণ্ডলপাড়া, বলরামপুর ও দামালগ্রাম এলাকায় প্রতিনিয়ত ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
ধরলা নদী: সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সাটকালুয়া ও জগমনের চর এবং ফুলবাড়ী উপজেলার গোরকমণ্ডপ ও বড়ভিটার পশ্চিম ধনিরাম এলাকায় তীব্র ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদ: সদর উপজেলার গোয়াইলপুরী ও পার্বতীপুর, নাগেশ্বরী উপজেলার ঝাউকুটি, পাগলার বাজার ও বালারহাট, উলিপুর উপজেলার দইখাওয়ার চর, রসুলপুর ও জলঙ্গারকুটি, চিলমারী উপজেলার কাচকোল, রৌমারী উপজেলার সোনাপুর, গেন্দার আলগা, খেদাইমারী ও সুখেরবাতি এবং রাজিবপুর উপজেলার সাজাই, পাইকানটারী ও বল্লবপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
তিস্তা নদী: রাজারহাট উপজেলার হাঁসারপাড়, রামহরি, চর বিদ্যানন্দ এবং উলিপুর উপজেলার হোকডাঙ্গা ও গোড়াইপিয়ার এলাকায় নদীর আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে।
কালজানি নদী: ভূরুঙ্গামারী উপজেলার উত্তর ধলডাঙ্গা ও বউবাজার এলাকায় নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সদর উপজেলার সারোডোব ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকডাঙ্গাসহ আরও কয়েকটি নতুন এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে।
পাউবো জানায়, তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভাঙনের মুখে পড়া মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। উলিপুর উপজেলার মোল্লারহাট এলাকার খুদিরকুঠি গ্রামের বাসিন্দা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন নদী কয়েক হাত করে এগিয়ে আসছে। কখন যে বাড়িভিটা নদীতে চলে যায়, সেই ভয়ে পরিবার নিয়ে রাত জেগে থাকি।”
রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের খেদাইমারী এলাকার ছকিনা বেগম বলেন, “একবার নদী আমার ঘর নিয়ে গেছে। আবার কষ্ট করে ঘর তুলেছি। এখন সেই ঘরও ভাঙনের মুখে। কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।”
উলিপুর উপজেলার গোড়াইপিয়ার এলাকার কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, “আবাদি জমি নদীতে গেছে, এখন বাড়িও যাবে। আমাদের মতো মানুষের বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ভাঙন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে ৩ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ লাখ বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ চলছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও জরুরি বরাদ্দ প্রয়োজন।
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ, কুড়িগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “একদিকে বন্যা, অন্যদিকে নদীভাঙন—এই দুই দুর্যোগে চরাঞ্চলের মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ সর্বস্ব হারানোর পরও অনেক সময় কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না। বৃদ্ধ বাবা-মা, শিশু সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে তারা কোথায় যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।”
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজির রহমান জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির জন্য ইতোমধ্যে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তা হিসেবে জেলায় নদীভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২৭৫ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও বিভিন্ন ধরনের মসলা।
এদিকে জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই কুড়িগ্রামে নদীভাঙনের এমন ভয়াবহ চিত্র উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নদীপাড়ের মানুষের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে জিওব্যাগ ফেলে এ স্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ভাঙন থেকে কুড়িগ্রামকে রক্ষা করতে স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছরের মতো এবারও শত শত পরিবার তাদের শেষ সম্বল নদীগর্ভে হারাবে।”
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

