ঢাকার সাভারে অটোরিকশা চুরির অপবাদ দিয়ে আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৩০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে কয়েক দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
নিহত আবুল খায়ের পাটোয়ারী চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর দাসাদী গ্রামের লোকমান পাটোয়ারীর ছেলে।
নিহতের প্রতিবেশী আব্দুল মোতালেব হোসেন জানান, আবুল খায়ের মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। গত রোববার ফজরের নামাজের পর তিনি চাঁদপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকে স্বজনেরা তাঁর সন্ধান করছিলেন। পরে রাতে সাভার মডেল থানা থেকে ফোন করে জানানো হয়, হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। থানায় গিয়ে স্বজনেরা মরদেহের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান। তাঁদের অভিযোগ, গণপিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কামরুন্নাহার জানান, গতকাল দুপুর ১টার দিকে দুজন ব্যক্তি অটোরিকশাযোগে এক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে এনে রেখে চলে যান। নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা মরদেহ উদ্ধার করে।
হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধারকারী সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘প্রথমে আমরা মরদেহটি অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করি। পরে র্যাবের সহযোগিতায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর পরিবারকে খবর দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতাল সূত্রে জানতে পেরেছি, দুজন ব্যক্তি তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে রেখে চলে যান। সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তদন্ত করছেন এসআই রফিকুল ইসলাম।’
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার সকাল ৯টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকার আল ইসলাম গার্মেন্টসের পেছন থেকে অটোরিকশা চুরির সন্দেহে আবুল খায়েরকে আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বেলা ১১টা পর্যন্ত সেখানে তাঁকে কয়েক দফা মারধর করা হয়। পরে তাঁকে অটোরিকশার মালিক নুরুজ্জামানের গ্যারেজে নেওয়া হলে সেখানেও তাঁর ওপর আবারও নির্যাতন চালানো হয়। পরে দুপুর ১টার দিকে গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামান ও অপর এক অটোরিকশাচালক তাঁকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
উলাইল এলাকার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার দিন এক অটোরিকশাচালক তাঁর ছোট ছেলেকে অটোরিকশা পাহারায় রেখে বাসায় খেতে যান। এ সময় আবুল খায়ের শিশুটিকে বলেন, ‘দুই দিন ধরে ভাত খাইনি। ভাত নিয়ে আসো।’ শিশুটি বিষয়টি বাবাকে জানালে তিনি এসে দেখেন, আবুল খায়ের অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে বসে আছেন। এরপর তাঁকে অটোরিকশা চোর সন্দেহ করে স্থানীয়রা মারধর শুরু করেন।
সোমবার দুপুরে উলাইল এলাকার কোটঘর মহল্লায় অবস্থিত নুরুজ্জামানের অটোরিকশা গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, প্রথমে তাঁর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি। পরে গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামান সেখানে আসেন।
নুরুজ্জামান বলেন, ‘আমার অটোরিকশাটি চালাচ্ছিলেন শুভ। সকালে অটোরিকশা চুরির সময় শুভ ও স্থানীয়রা ওই ব্যক্তিকে আটক করে মারধর করেন। পরে সকাল ১১টার দিকে তাঁকে আমার গ্যারেজে আনা হয়। সেখানে অন্য কয়েকজন অটোরিকশাচালকও তাঁকে মারধর করেন। আমি তাঁকে মারধর করিনি। আমি হৃদরোগে আক্রান্ত। পরে একজন চালকের সহযোগিতায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ভয় পেয়ে সেখান থেকে চলে আসি।’
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পর পুলিশ তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বললেও তাঁকে থানায় নেয়নি।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ জানান, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অটোরিকশাচালক সবুজ ওরফে শুভকে আটক করা হয়েছে।
গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামানকে কেন তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাঁকে থানায় নিয়ে আসার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলামকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁকে আগে কেন থানায় আনা হয়নি, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

