যে মৃত্যু চিৎকার শুনি নাই? স্বজন হারানোর বেদনা বুঝি নাই ?
আজ ৩ মে ২০০২—একটি রাত, যেটা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; অসংখ্য মানুষের জীবনে এটি এক অবিরাম শোকের দিন । ঢাকা সদরঘাট থেকে যাত্রা করা এমভি সালাউদ্দিন-২-এর মানুষগুলো তখনও জানত না-এটাই তাদের শেষ একসাথে থাকা।
কেউ মায়ের আঁচল ধরে ছিল, কেউ বাবার হাত শক্ত করে ধরেছিল। কেউ হাসছিল, কেউ স্বপ্ন দেখছিল-আর সেই স্বপ্নগুলোই নদীর পানিতে ডুবে যাবে, কেউ কল্পনাও করেনি। যখন লঞ্চটি ষাটনল-এর কাছে পৌঁছালো, তখন প্রকৃতি যেন হঠাৎ ঝড়, বৃষ্টি, অন্ধকার-সব মিলিয়ে এক অমানবিক রাত।
আর তারপর…এক মুহূর্তেই সব শেষ। যে মা একটু আগেও সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, সেই মা শেষ মুহূর্তে তাকে বুকে চেপে ধরে পানিতে ডুবে গেল। যে বাবা বলছিল “ভয় পাস না”, সেই বাবা নিজেই আর ফিরে এল না। একটি শিশু হয়তো শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠেছিল-“মা!”-কিন্তু সেই ডাক আর কেউ শোনেনি।নদী সেদিন শুধু মানুষ নেয়নি-নিয়ে গেছে ডাক, স্পর্শ, ভালোবাসা, সম্পর্কের সব রঙ।
ভোর হলে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানুষ। কারও চোখে ঘুম নেই, শুধু অপেক্ষা-“হয়তো এখনই আসবে… হয়তো বেঁচে আছে…” কিন্তু নদী ফিরিয়ে দিয়েছিল নিথর দেহ-নীরব, ঠান্ডা, চিরতরে নিশ্চুপ। একজন মা তার সন্তানের নিথর শরীর বুকে নিয়ে বসে ছিল-কাঁদছিল না, শুধু তাকিয়ে ছিল। কারণ কান্নার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছিল সে। একজন স্ত্রী স্বামীর মুখে হাত বুলিয়ে বলছিল-“এইভাবে রেখে গেলে?” কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি।
অনেকেই কাউকে খুঁজে পায়নি-আজও তারা জানে না, তাদের প্রিয় মানুষটি নদীর কোন গভীরে ঘুমিয়ে আছে। রাঙ্গাবালী, বাউফল, দশমিনা-এসব এলাকার ঘরে ঘরে সেদিন নেমে এসেছিল নীরবতা। চুলা জ্বলেনি, হাসি শোনা যায়নি, শুধু কান্নার শব্দ ভেসে বেড়িয়েছে। সন্তানহারা মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে-হয়তো মনে মনে ভাবে, “আজকে কি ফিরবে?” স্বামীহারা স্ত্রী এখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়—
কারণ সে অভ্যস্ত ছিল কারও পাশে থাকার।
এই শোকের কোনো শেষ নেই। সময় কেটে যায়, কিন্তু যাদের হারানো হয়েছে—তারা আর ফিরে আসে না। আজও নদীর পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, বাতাসে ভেসে আসে সেই রাতের আর্তনাদ-“বাঁচাও…” এমভি সালাউদ্দিন-২ শুধু একটি লঞ্চের নাম নয়-এটি হাজারো ভাঙা হৃদয়ের গল্প, হাজারো অপূর্ণ জীবনের ইতিহাস। আল্লাহ্ তাদের সবাইকে জান্নাত দান করুন। আর যারা প্রিয়জন হারিয়ে বেঁচে আছেন-তাদের বুকের এই ভার হালকা করে দিন।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

