নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলায় সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বোরো ধান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পাহাড়ি ঢল আসার আগেই অতিবৃষ্টি সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির পানি আটকে হাওরগুলো যেন ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। ফসল রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। তারা নিজেদের উদ্যোগে ফসল রক্ষা বাঁধ (ক্লোজার) কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করতে চান, তবে প্রশাসনিক অনুমতি না থাকায় তা করতে পারছেন না।
হাওরবেষ্টিত এই উপজেলায় ফসল রক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধ এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ। নদীর পানি ঠেকাতে বাঁধ দেওয়া হলেও হাওরের ভেতরের বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে জলাবদ্ধতায় কাঁচা ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে চাকুয়া ইউনিয়নের লেপসিয়া পিয়াই নদী ও ধনু নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় নির্মিত বাঁধটি জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দ্রুত ওই বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নিলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
খালিয়াজুড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে অনেক কৃষকের বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। ফলে ফসল নষ্ট হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বছরের একমাত্র ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। তারা উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “অতিবৃষ্টির কারণে প্রায় সব হাওড়েই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে যেসব এলাকায় এখনো ‘বাঁধ সার্ভে’ সম্পন্ন হয়নি, সেসব বাঁধ না কাটার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।” তিনি জানান, দুই-তিন দিনের মধ্যে সার্ভে শেষ হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “মোট আবাদি জমির প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।”
চাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফজলু মিয়া বলেন, “লেপসিয়া পিয়াই ও ধনু নদীর মাঝামাঝি এলাকায় বাঁধের কারণে ২-৩ হাত পানি জমে রয়েছে। সাময়িকভাবে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করা গেলে হাজারো কৃষকের দুশ্চিন্তা কমবে।”
খালিয়াজুড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে সভা করা হয়েছে এবং সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। তবে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ কাটা হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধানে খাল সচল করা, সুইচগেট সংযুক্ত করা এবং পাইপের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত পানি অপসারণ করা না গেলে উপজেলার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বোরো ধান নষ্ট হয়ে খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
একুশে সংবাদ/যাবিদ



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

