সরকারের পৃষ্টপোষকতার অভাব
আয় কমে যাওয়ায় শতাধিক কারুশিল্পী পেশা বদলাচ্ছেন
মৌলভীবাজারে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য শীতল পাটি। একসময় দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যবহার হলেও এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রায় বিলুপ্তির পথে এই শিল্প।
পাটি শিল্প বাংলাদেশের লোকাচারে জীবন ঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান। এক সময় গ্রামের বাড়িতে অতিথিরা এলে প্রথমেই বসতে দেওয়া হতো পাটিতে।
এমনকি হাতে বানানো এই শীতলপাটি একে অপরকে উপহার হিসেবেও দেওয়া হত। গৃহকর্তার বসার জন্যও ছিল বিশেষ ধরনের পাটি। গরমকালে শীতলপাটির কদর ছিল বেশ। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের দুপুরে এই পাটি দেহ-মনে শীতলতা আনে। বর্তমানে যুগের আধুনিকায়নে পাটি শিল্পের স্থান দখল করে নিয়েছে টাইলস, ফ্লোরম্যাট ও প্লাস্টিকের সামগ্রি।
আগে জেলার রাজনগরসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই শীতলপাটি বুনন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ার ভিড়ে মানুষের রুচির পরিবর্তন এসেছে, যার কারণে কমে যাচ্ছে শীতল পাটির ব্যবহার।
বর্তমানে রাজনগর, বড়লেখা উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামের বধূ-কন্যাদের নান্দনিক এ কারুকার্য এখন জৌলুস হারিয়েছে। এখন শুধু ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্যই কেউ কেউ এই শিল্পটিতে রয়েছেন। শীতল পাটি তৈরি হয় উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ধুলিজুড়া ও উত্তরভাগ ইউনিয়নের যুগিকোনায়। এছাড়াও জেলার বড়লেখা উপজেলার দাসেরবাজার ও তালিমপুর ইউনিয়নে এখনও শীতল পাটি তৈরি হয়।
বিশেষ করে রাজনগর উপজেলার ধুলিজোড়া গ্রামের কারুশিল্পীদের বানানো শীতল পাটির এক সময় বেশ কদর ছিল। স্বল্পমূল্যের প্লাস্টিকের মাদুরের দাপটে অতীত জৌলুস হারিয়েছে শীতল পাটি। এতে আয় কমে যাওয়ায় ধুলিজোড়া গ্রামের শতাধিক কারুশিল্পী জীবিকা নির্বাহে পেশা বদলে বাধ্য হয়েছেন।
রাজনগর-বালাগঞ্জ খেয়াঘাট সড়কের পাশের একটি নিভৃত গ্রামের নাম ধুলিজোড়া। যে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন ধরনের শীতল পাটি বানিয়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। সরজমিনে ধুলিজোড়া গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাসের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে কারুকার্যখচিত শীতল পাটি বানিয়ে রোদে শুকাতে দিচ্ছেন; দুখানা পাটির একখানা ভাঁজ করে বারান্দায় রেখেছেন।
আরো দুটি মাদুর বানিয়ে রেখেছেন। আলাপকালে তিনি জানান ৪-৫ হাত বিশিষ্ট কারুকাজ করা একটা শীতল পাটি বানাতে ৩০-৩৫ দিন সময় লাগে। এর সঙ্গে হাজারথেকে বারশ টাকার বেত ও রং লাগে।
পালঙ্কের জন্য একটি ‘নঙা’ করা পাটি ২৮-৩০ হাজার টাকা দাম পড়ে। এসব শীতল পাটি শৌখিন ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ব্যবহার করেন। এছাড়া একটি সাধারণ মানের পাটি ৫-৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। তিনি জানান, আগেকার দিনে বিয়ে-শাদিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং গরমের দিন এলেই শীতল পাটি কেনা হতো।
এখন এ স্থান দখল করেছে চায়না প্রযুক্তির প্লাস্টিকের মাদুর। কারুশিল্পিী অরুণ চন্দ্র দাস আরো জানান, সরকারি সহযোগিতায় শীতল পাটির কারিগর হিসেবে তিনি ২০১৩ সালে জাপানে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প মেলায় এবং ২০২৩ সালে চীন গিয়েছিলেন। সেখানে ধুলিজোড়ায় বানানো শীতল পাটি প্রদর্শন ও বিক্রি হয়েছে। ‘নঙা’ আঁকা শীতল পাটি চীন ও জাপানে বেশ সমাদৃত হয়েছে।
এসব প্রদর্শনীতে তাঁর সঙ্গে গ্রামের হরেন্দ্র দাস ও গীতেশ দাস অংশ নেন। একই গ্রামের পমেশ দাস, দ্বিজেন্দ্র দাস, শৈতেন্দ্র দাস, গোপাল দাস, সুশীল দাস, গোবিন্দ দাসসহ আরো কয়েকজন শীতল পাটির কারিগর জানান, প্লাস্টিকের কম দামি মাদুরের কারণে শীতল পাটি আগের মতো বিক্রি হয় না। এতে তাদের আয় কমে যাওয়ায় অনেকে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
রাজনগর ও বড়লেখা উপজেলার কারুশিল্পিীরা জানান, পাটি শিল্পে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। তাদের বাপ-দাদারে দেখে এ পেশায় জড়ান ছিলেন তারা। তবে এখ আগের মতো পাটি বিক্রি না হওয়ায় এ পেশায় তাদের টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার থেকে কোনো ধরণের সহযোগিতাও তারা পাচ্ছেন না বলে তাদের অভিযোগ। যার কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
পাটি শিল্পিীরা জানান, শীতল পাটি তৈরির মূল উপাদান (কাঁচামাল) বেতা তৈরিতে অনেক পরিশ্রমের প্রয়োজন। পরিশ্রমের বিপরীতে বাজার দর ভালো না হওয়ায় দিন দিন একেবারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তৈরী কারিগররা।
কারুশিল্পিীদের ভাষ্যে একটি পাটি তৈরি করতে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। নকশা ছাড়া একটি পাটির চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে অর্ডার দিয়ে মসজিদ, মন্দির, মিনার কিংবা ব্যক্তির নাম দিয়ে তৈরি করলে দাম পড়ে ২৫ হাজার টাকা।
বিভিন্ন রঙের নামের পাটির মধ্যে রয়েছে সাদা পাটি, গুছি রঙ্গা পাটি, আসমান তারা, চৌদ্দ ফুল, কমল গুশ পাটিসহ হরেক রকম পাটি। এছাড়াও এখন মুর্তার বেত দিয়ে তৈরি করছেন কলমধানি, ভ্যানিটিব্যাগ, কোর্ট ফাইল, মানিব্যাগ, ওয়ালম্যাট ও জায়নামাজ।
ব্যাংকার আব্দুল হালিম বলেন, ঐতিহ্য লালন করে হাতে তৈরি শীতল পাটি। এখনও চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমরা সঠিকভাবে বাজার ধরিয়ে দিতে পারছি না তাদের। এ জন্য সরকারিভাবে এগিয়ে আসা দরকার। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানকার শীতল পাটি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

