আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হলেও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কর্মচারীদের জীবনে এই দিবসের বাস্তবতা যেন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং কর্মী, বাবুর্চি, নিরাপত্তারক্ষী ও মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কাছে মে দিবস অন্যান্য দিনের মতোই একটি কর্মব্যস্ত দিন। দীর্ঘদিন ধরে তারা পর্যাপ্ত ছুটি, ন্যায্য মজুরি ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ডাইনিং কর্মী মমতাজ জানান, তিনি ১৯৮৭ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এর পরও শিক্ষার্থীরা রান্না করলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়। বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, ঈদের সময়ও তারা প্রকৃত ছুটি পান না। কোরবানির ঈদে সকালে কাজ করে আবার রাতে ডিউটিতে ফিরতে হয়। রোজার ঈদেও সামান্য সময় ছুটি মিললেও রাতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। “দিবস আসে, যায়—কিন্তু আমাদের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না,” যোগ করেন তিনি।
ডাইনিং কর্মীদের অভিযোগ, তারা মাসে ৩০ দিন কাজ করলেও বেতন পান মাত্র ২২ দিনের। জনবল সংকটের কারণে পুরো মাস কাজ করলেও অতিরিক্ত দিনের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।
সহকারী বাবুর্চি মো. আমিরুল ইসলাম জানান, তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে টানা ৩২ বছর কর্মরত। তার ভাষ্য, “২৪ ঘণ্টার মতোই কাজের চাপ। সাপ্তাহিক ছুটিও নেই। কিন্তু মাস শেষে বেতন পাই মাত্র ২২ দিনের।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী জানান, আগে তাদের দৈনিক হাজিরা ছিল ৬০০ টাকা, বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হলেও ৩০ দিনের পূর্ণ বেতন তারা পান না। হিসাব অনুযায়ী পাওনা ২২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও তারা পান প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা।
অন্যদিকে নিরাপত্তারক্ষীরাও ভিন্ন ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। প্রশাসনিক ভবনে কর্মরত নিরাপত্তারক্ষী মোহাম্মদ মনিরুল হক বলেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো জিনিস চুরি হলে অনেক সময় তার ক্ষতিপূরণ তাদের বেতন থেকেই কেটে নেওয়া হয়। “একটি এসি বা তার চুরি হলেও দায় আমাদের ওপর পড়ে,” বলেন তিনি।
প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাবে তারা নিজেদের অসহায় মনে করছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বেতন কর্তন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
তবে সব কষ্টের মাঝেও কিছু ইতিবাচক দিক খুঁজে পান অনেকে। হর্টিকালচার ফিল্ডের মাঠকর্মী রিপন বলেন, “রোদ-বৃষ্টিতে কাজ করতে হয়, কষ্ট হয়। কিন্তু দেশের জন্য কাজ করছি—এই ভাবনাটা ভালো লাগে।”
মে দিবসে বাকৃবির এসব শ্রমজীবী মানুষের একটাই প্রত্যাশা—ন্যায্য মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসবের ছুটি এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তা। শ্রমিক দিবসের চেতনা যেন তাদের বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হয়, সেই প্রত্যাশাতেই দিন গুনছেন তারা।
একুশে সংবাদ/যাবিদ



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

