বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ধর্মীয় সহাবস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বরাবরই পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পূজা হোক কিংবা রোজা—ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও মানবিক সহমর্মিতার যে চর্চা জাবিতে গড়ে উঠেছে, তা দেশের সামগ্রিক সামাজিক সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে দুর্গাপূজা ও রমজান মাস এলেই এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক অনন্য দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। দুর্গাপূজার সময় মুসলিম শিক্ষার্থীদের মণ্ডপে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি রমজানে হিন্দু শিক্ষার্থীদের ইফতার আয়োজন, ক্লাস ও পরীক্ষার সময়সূচিতে সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মানও প্রশংসনীয়। ধর্ম এখানে বিভাজনের নয়, বরং সহাবস্থানের ভাষা হয়ে ওঠে।
জাবির এই ধর্মীয় সম্প্রীতির সংস্কৃতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রসংগঠন, শিক্ষকসমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রয়াসে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে উঠেছে। ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, যৌথ উৎসব উদযাপন এবং মানবিক উদ্যোগগুলো ধর্মীয় ভিন্নতাকে অতিক্রম করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের প্রবণতা নানা দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চর্চা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জীবন দাস বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাঙ্গন নয়, এটি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ। এখানে পূজা এলে মুসলিম শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিরাপত্তা, আয়োজন ও সহযোগিতায় অংশ নেয়; আবার রোজা এলে হিন্দু শিক্ষার্থীরাও ইফতার আয়োজন, সৌজন্য ও বন্ধুত্বে সামিল হয়। ধর্ম এখানে বিভাজনের নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সহাবস্থান ও মানবিকতার সেতুবন্ধন। তাই বলা যায়—জাবিতে ধর্ম নয়, মানুষই আগে; আর এই মানবিক বন্ধনই আমাদের প্রকৃত শক্তি।”
কুরআন অ্যান্ড কালচারাল স্টাডি ক্লাব—জাবির সভাপতি সাদমান জাহাঙ্গীর বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। তাই এখানে সব ধর্মের শিক্ষার্থী একসঙ্গে ক্যাম্পাসে যেভাবে মিলেমিশে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, সেটি দেশে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা। বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থী থাকলেও তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনেও তারা মিলেমিশে কাজ করছে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ক্যাম্পাসের উন্নয়নের জন্য।
মুসলিম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আয়োজনে যেমন অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা স্বচ্ছন্দে অংশগ্রহণ করে, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজনেও যেন কোনোভাবে নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে আমরা খেয়াল রাখার চেষ্টা করি। এসব বিষয়ই ধর্মীয় সম্প্রীতিতে জাবিকে অনন্য করে তুলেছে।”
ইসলামেও ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সূরা মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: “দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।”
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করবে বা তার প্রাপ্য কম দেবে, কিংবা তাকে তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে—কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হব।” কুরআন ও হাদিসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে বারবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের সভাপতি স্বদীপ চন্দ্র রায় বলেন, “বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রগতিশীল চেতনার জন্য যেমন পরিচিত, তেমনি ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জন্মাষ্টমী, সরস্বতী পূজা ও শিবরাত্রি ব্রতের সময় যেমন বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে, তেমনি পবিত্র রমজান মাসে ইফতার মাহফিলে আমরা সবাই একসঙ্গে বসে সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ হই। ঈদের শুভেচ্ছা যেমন সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি পূজার আনন্দও হয়ে ওঠে সবার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মন্দির, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন—সবই পাশাপাশি অবস্থান করে এক সুন্দর সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানে ধর্ম কোনো বিভেদের কারণ নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধই আমাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি। শিক্ষার্থীরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এবং যেকোনো সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।”
বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যখন নানা স্থানে ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা চোখে পড়ে, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করে—মানবতাই সর্বোচ্চ ধর্ম। ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান আমাদের সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করে। বহুত্বের মধ্যেই সৌন্দর্য, আর সেই বহুত্বকে ধারণ করেই আমাদের পথচলা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পূজা কিংবা রোজা—উৎসবের ধরন আলাদা হলেও জাবিতে তার মূল সুর একটাই: সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবিক সহাবস্থান। এই কারণেই ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিঃসন্দেহে অনন্য।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

