নিম্নচাপ, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা বন্যার কবলে পড়ছে।
পানিবন্দি লাখো মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, কৃষি ও মৎস্য খাতে শত শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, খোয়াই, মনু, কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের মারকুলি এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা এবং ভুগাই-কংস নদীর পানিও কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চল আরও বেশি প্লাবিত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আগামী ৪৮ ঘণ্টা সারাদেশে মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে
বর্তমানে দেশের অন্তত সাতটি জেলা বন্যাকবলিত রয়েছে এবং আরও আটটি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
নদী, খাল ও ছড়া উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলায় বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায়। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে।
প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখেরও বেশি। অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে বুকসমান পানি জমে থাকায় মানুষ নৌকায় চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। নৌকার স্বল্পতার কারণে বহু মানুষ বাড়িতেই আটকা পড়ে আছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকটে তাদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন কয়েকজন। কক্সবাজারগামী ট্রেন মাঝপথে আটকা পড়েছে এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ২০টি সড়কের ৫০ কিলোমিটারের বেশি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন শত শত কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং অসংখ্য সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাঙামাটির বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়ি ও বরকল উপজেলায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। বিশেষ করে দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে প্রায় পুরো জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রবল স্রোতের কারণে নৌকা চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেখানে নিয়মিত ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
প্রায় ১২ হাজার মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে। সীমান্ত সড়ক ভেঙে যাওয়ায় স্থলপথেও যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের নদী, খাল ও ছড়াগুলো উপচে পড়ে বসতঘর, কৃষিজমি ও বাজার প্লাবিত করেছে। অনেক মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে এবং গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকা বন্যার ঝুঁকিতে থাকলেও এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ভয়াবহ বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বান্দারবানে বানের পানিতে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার পুকুর ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে।
এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯১ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে হাজার হাজার পুকুর ও শতাধিক চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া ও অন্যান্য উপজেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আউশ ধান, আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপে হাজার হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
একইভাবে চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, সাতকানিয়া, পটিয়া ও অন্যান্য উপজেলায় বিস্তীর্ণ সবজিখেত নষ্ট হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং খাদ্য উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বন্যার কারণে শুধু কৃষি নয়, স্থানীয় অর্থনীতিও বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।
বাজার, দোকানপাট ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। পর্যটননির্ভর কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিতেও পর্যটক সমাগম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাহাড়ধস ও সড়ক বিচ্ছিন্নতার কারণে পর্যটন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে গেছে।

বন্যা মোকাবিলায় সরকার, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চট্টগ্রাম জেলায় ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সেখানে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
বন্যার্তদের জন্য শত শত মেট্রিক টন চাল, নগদ অর্থ, শুকনো খাবার এবং রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় স্পিডবোটের মাধ্যমে উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় দখল, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পাহাড় কাটার মতো কর্মকাণ্ডও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তাই শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, খাল পুনরুদ্ধার, পাহাড় সংরক্ষণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত ধীরে ধীরে কমে এলে বন্যার পানি নামতে শুরু করতে পারে। তবে উজানে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নতুন করে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে থাকে। তবে এবারের দুর্যোগের ব্যাপ্তি ও ক্ষয়ক্ষতি আবারও প্রমাণ করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আরও সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষি ও মৎস্য খাতের পুনরুদ্ধার এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

