কালের নিয়মে রাজদণ্ড ভেঙেছে, বিলীন হয়েছে জমিদারি প্রথা। নেই আগের সেই শান-শওকত, হাতি-ঘোড়ার দাপট কিংবা পাইক-পেয়াদাদের হাঁকডাক।
তবুও চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৮নং পাইকপাড়া (দঃ) ইউনিয়নের কড়ৈতলী গ্রামে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী ‘কড়ৈতলী জমিদারবাড়ি’। রাজপরিবারের কেউ আজ আর এখানে নেই, তবে তাদের রেখে যাওয়া পোড়া ইট-পাথরের অনন্য স্থাপত্যশৈলী আজও মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।
বর্তমানে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমিদারবাড়ির প্রাচীন দেয়ালগুলোতে জেঁকে বসেছে শেওলা আর পরজীবী উদ্ভিদ। ফাটল ধরা দেয়ালে বাসা বেঁধেছে বুনো লতা-পাতা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দিন দিন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার বাহ্যিক সৌন্দর্য হারাচ্ছে। ঝোপঝাড় ও আগাছার আধিপত্যের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ছে শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য।
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১২২০ বঙ্গাব্দের দিকে হরিশ চন্দ্র বসুর হাত ধরে কড়ৈতলীতে এই জমিদার বংশের গোড়াপত্তন ঘটে। এরপর দীর্ঘ সময় এই অঞ্চল শাসন করেন তাঁরা। অবশেষে ১৯৫১ সালে জমিদার গোবিন্দ চন্দ্র বসুর হাত ধরে সমাপ্তি ঘটে এই রাজপরিবারের শাসনকালের।
একসময় প্রায় ৩০০ একর বিশাল এলাকাজুড়ে এই জমিদারদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত থাকলেও, কালের বিবর্তনে বর্তমানে তা সামান্য কিছু জায়গাজুড়ে টিকে আছে। তাঁরা অভিযোগ করেন, বর্তমানে এখানে দিনের বেলায়ও মাদকের আড্ডা বসে। একসময় বহু ভ্রমণপিয়াসী এখানে এলেও মাদক কারবারিদের কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা এখন কমে গেছে।
স্থানীয় সিদ্দিক আহমেদ, আরিফ পাটওয়ারী, তাঁরা অভিযোগ করেন, বর্তমানে এখানে দিনের বেলায়ও মাদকের আড্ডা বসে। একসময় বহু ভ্রমণপিয়াসী এখানে এলেও মাদক কারবারিদের কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা এখন কমে গেছে।
স্থানীয়ভাবে ‘বাবুর বাড়ি’ নামে পরিচিত এই রাজবাড়িতে এখনো রয়েছে ঐতিহাসিক দুর্গামন্দির, ধ্বংসপ্রায় রাজপ্রাসাদ, প্রাচীন অট্টালিকা, তৎকালীন বিচারকার্য পরিচালনার কাছারি ঘর ও রহস্যময় সুড়ঙ্গপথ।
এ ছাড়া ‘বাবুর দীঘি’ নামে পরিচিত বিশাল এক জলাশয় রয়েছে এবং কড়ৈতলী বাজারের কাছেই রয়েছে প্রাচীন ‘শ্মশানকালী মন্দির’, যদিও সেখানে এখন আর আগের মতো নিয়মিত পূজার আয়োজন হয় না।
জমিদারদের বংশধররা বহু আগেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন এবং বর্তমানে তাঁদের কেউ আর এখানে খোঁজ নিতে আসেন না। তবে ‘বাবুর বাড়ি’র আকর্ষণ কমেনি একটুও। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুজন জানান, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এই প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী দেখতে আসে। কিন্তু বর্তমানে পরিবেশের অবস্থা খুবই খারাপ।
এলাকাবাসীর দাবি, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটিকে যদি প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, তবে এটি দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এতে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল হবে, তেমনি রক্ষা পাবে একটি প্রাচীন ইতিহাস।
ফরিদগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। জমিদারবাড়ির আশপাশেও বিশেষ নজরদারি রাখা হবে।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, বেদখলের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে এবং ফরিদগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঐতিহ্যপ্রেমীদের প্রত্যাশা, দ্রুতই সরকারি উদ্যোগে প্রাণ ফিরে পাবে কড়ৈতলীর এই ‘বাবুর বাড়ি’ এবং টেকসই হবে চাঁদপুরের ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

