সুস্থ শরীর ও ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। কর্মজীবনের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের যত্ন, পরিবারের নানা কাজ এবং অদৃশ্য মানসিক চাপ বা ‘মেন্টাল লোড’-সব মিলিয়ে দিনের শেষে নিজের বিশ্রামের জন্য খুব কম সময়ই অবশিষ্ট থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না, বরং হরমোনের ভারসাম্য, মানসিক স্বাস্থ্য, ওজন, হৃদ্স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নারীদের কি সত্যিই বেশি ঘুম দরকার?
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও পুরুষের ঘুমের চাহিদা একেবারে একই রকম নয়। ডিউক ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার-এর গবেষণা অনুযায়ী, নারীদের মস্তিষ্ক ও হরমোনগত কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল হওয়ায় অনেকের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি বিশ্রামের প্রয়োজন হতে পারে। আবার লাফবরো ইউনিভার্সিটির স্লিপ রিসার্চ সেন্টার-এর গবেষকরাও মনে করেন, সারাদিন মস্তিষ্ক যত বেশি কাজ করে, রাতে সেটির পুনরুদ্ধারের জন্য তত বেশি ঘুম দরকার হয়।
তবে মনে রাখা জরুরি, সবার জন্য নির্দিষ্টভাবে এক থেকে দুই ঘণ্টা বেশি ঘুম প্রয়োজন-এমন সিদ্ধান্তে সব গবেষণা একমত নয়। ঘুমের চাহিদা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
হরমোনের ওপর প্রভাব
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) বেড়ে যায়, আর ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এছাড়া ঘুমের অভাব ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামাতেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা মাসিক চক্র এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানসিক স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হয়
কম ঘুমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মস্তিষ্কের ওপর। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং স্মৃতিশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিরক্তি এবং মুড সুইং বেড়ে যেতে পারে। অনেকেই সারাদিন ক্লান্ত বোধ করেন, ছোট ছোট বিষয়েও রাগ বা হতাশা অনুভব করেন। দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
মাসিক চক্র ও প্রজনন স্বাস্থ্যে প্রভাব
ঘুমের ঘাটতি মাসিক চক্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ঋতুচক্র অনিয়মিত হওয়া, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং প্রজনন স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এছাড়া ঘুমের সঙ্গে মেলাটোনিন হরমোনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই হরমোন শরীরের ঘুম-জাগরণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুমের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়িও ব্যাহত হতে পারে।
ওজন ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। ফলে মিষ্টি, কার্বোহাইড্রেট ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। এর ফলে ওজন দ্রুত বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব থাকলে শরীরে প্রদাহের মাত্রাও বাড়তে পারে, যা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ঘুমানো সব সময় সম্ভব না হলেও ভালো স্লিপ হাইজিন মেনে চললে ঘুমের মান অনেকটাই উন্নত করা যায়।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহার কমিয়ে দিন।
সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।
শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখুন।
দিনের বেলায় নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম করবেন না।
ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পর্যাপ্ত ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিজের শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার অংশ হিসেবে ভালো ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম দীর্ঘমেয়াদে শরীরকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি কর্মক্ষমতা, মানসিক স্থিতি এবং জীবনমান উন্নত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

