সফল ব্যক্তিদের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, তারা খুব কমই বিচলিত হন। তাদের উচ্চস্বরে কথা বলা বা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কম।
শান্ত থাকা বলা যতটা সহজ, বাস্তবে তা অর্জন করা ততটা সহজ নয়। কারণ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের প্রায়ই চাপপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়—রাগী গ্রাহক, বিরক্তিকর বস, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক চাপ কিংবা এমন দিন, যখন মনে হয় সবকিছুই একসঙ্গে ভুল হচ্ছে।
তবে ভালো দিক হলো, স্থির থাকা কোনো জন্মগত গুণ নয়; এটি একটি দক্ষতা, যা চর্চার মাধ্যমে অর্জন করা যায়।
১. তাড়াহুড়োর প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলুন
মানসিক চাপে পড়লে অনেকেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। অন্য কেউ কথা বলার সময়ই তারা নিজের জবাব তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে অন্যের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার পরিবর্তে তারা আত্মপক্ষ সমর্থন, পাল্টা যুক্তি খোঁজা কিংবা সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিস্থিতি কল্পনা করতে শুরু করেন। অথচ কার্যকর যোগাযোগের জন্য প্রয়োজন ঠিক উল্টোটা—প্রথমে পুরো বিষয়টি বুঝে নেওয়া, তারপর প্রতিক্রিয়া জানানো।
মনে রাখতে হবে, দ্রুত প্রতিক্রিয়াই সবসময় সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া নয়। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও ভুল বোঝাবুঝির শুরু হয় তাৎক্ষণিক আবেগপ্রসূত মন্তব্য থেকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে দেওয়া উত্তর মূল সমস্যার চেয়েও বড় জটিলতা তৈরি করে।
তাই পরবর্তীবার কোনো চাপপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে কিছুটা সময় নিন। এর অর্থ কঠিন আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং আবেগ ও বাস্তবতাকে আলাদা করে দেখার জন্য নিজেকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া। শান্ত স্বভাবের মানুষ কম আবেগপ্রবণ হন না, তবে তারা আবেগকে নিজের সিদ্ধান্ত ও আচরণের নিয়ন্ত্রক হতে দেন না।
২. সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিন
প্রতিটি আলোচনায় জেতার চেষ্টা না করে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকে মনোযোগ দিন। এই মানসিকতা কর্মক্ষেত্রের বাইরেও উপকারী। অনেক পরিস্থিতি চাপ সৃষ্টি করে কারণ এতে আমাদের অহং জড়িয়ে পড়ে। সহকর্মী আমাদের আইডিয়ার সমালোচনা করতে পারে। বন্ধু আমাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারে। কেউ হয়তো ভুল ধরিয়ে দেয়। তখন হঠাৎ করেই আমাদের অনেকের লক্ষ্য সমস্যা সমাধান থেকে সরে গিয়ে আত্মরক্ষায় পরিণত হয়। কিন্তু আসল কথা হলো, সঠিক হওয়া সবসময় জীবনকে সহজ করে না।
কল্পনা করুন, আপনি পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে তর্কে আটকে আছেন। আপনি হয়তো তর্কে জিততে পারেন, কিন্তু তারপরেও সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কখনও কখনও একটি সহজ প্রশ্ন করার মাধ্যমেই স্থিরতা আসে- আমি আসলে এখানে কী ফলাফল চাই? আপনি কি শান্তি চান? অগ্রগতি? কোনো সমাধান? নাকি আপনি শুধু নিজের বক্তব্য প্রমাণ করতে চান? এগুলো খুব ভিন্ন লক্ষ্য। যারা শান্ত থাকেন, তারা জয়ের চেয়ে ফলাফলের ওপর বেশি মনোযোগ দেন।
৩. দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন
দিনের পরিবর্তে বছরের হিসাবে চিন্তা করুন। অনেক মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে কারণ তারা প্রতিটি ব্যর্থতাকে একটি বিপর্যয় হিসাবে দেখে। একটি খারাপ মিটিংকে ক্যারিয়ারের ব্যর্থতা বলে মনে হয়। একটি ভুলকে স্থায়ী বলে মনে হয়। একটি প্রত্যাখ্যানকে পথের শেষ বলে মনে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সমস্যাই সেই মুহূর্তে যতটা বড় মনে হয়, তার চেয়ে ছোট। কোনো কিছুই রাতারাতি ঘটে না। সাফল্য আকস্মিক উল্লম্ফনের মাধ্যমে নয়, বরং ধারাবাহিক অগ্রগতির মাধ্যমে অর্জিত হয়। এই একই নীতি দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
যখন কোনো চাপপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন- এক বছর পর কি এটা কোনো ব্যাপার হবে? অনেক সময়, উত্তরটি হয়- না। এর মানে এই নয় যে আপনার বর্তমান সমস্যাটি বাস্তব নয়। এটি কেবল বিষয়গুলোকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করে। আজকের হতাশা সাধারণত একটি অনেক বড় গল্পের একটি ছোট অধ্যায় মাত্র। এভাবে চিন্তা করলে শান্ত থাকা সহজ হবে। যারা সব পরিস্থিতিতে শান্ত থাকেন, তারাও চাপ অনুভব করেন। তবে সেটি তারা নিজেরাই বুদ্ধি, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা দিয়ে সামলে নিতে পারেন।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

