ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আট দিন পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং দুই পক্ষই হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে ইরানে আরও বড় ধরনের হামলা চালানো এবং সম্ভাব্য সব শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এদিকে ওই হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে নতুন দফায় হামলা শুরু করেছে ইরান। এসব হামলায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে দেশটি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্য কোনো বড় শক্তির সরাসরি সহায়তা ছাড়া ইরান কতদিন প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে।
এ বিষয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বর্তমান মাত্রায় চলমান যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির বরাতে আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান গতির এই তীব্র যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস চালিয়ে যেতে সক্ষম।”
আইআরজিসি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সংস্থা। সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতেও এ বাহিনীর প্রভাব রয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাইনির এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, “আমরা এই যুদ্ধে বড় ব্যবধানে জিতছি। আমরা তাদের পুরো ‘শয়তানি সাম্রাজ্য’ গুঁড়িয়ে দিয়েছি।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনেও তিনি যুক্ত থাকতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নতুন নেতা নির্বাচন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঘোষণা দেন, ইরান কখনও আত্মসমর্পণ করবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
এর জবাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান। টানা নয় দিনের এই হামলা-পাল্টা হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যই এখন তীব্র উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাব্য নতুন লক্ষ্যবস্তু খুঁজছে ইরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিস্তৃত করার হুমকি দিয়েছে। ফলে ইরান এখন মার্কিন বাহিনী, ঘাঁটি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে নতুন দফায় হামলার দাবি করেছে ইরান। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় হাইপারসনিক ‘ফাত্তাহ’ এবং ব্যালিস্টিক ‘এমাদ’ ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। ঘণ্টায় এর গতি প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিশেষ করে ইরানের তৈরি ‘ফাত্তাহ-২’ ক্ষেপণাস্ত্রকে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সামরিক সাময়িকী মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রযুক্তিতে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে বিপুল সামরিক ব্যয়ের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনেই প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে, যুদ্ধের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

