ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ের কবলে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তীব্র তুষারপাত, বরফ জমা ও হিমশীতল বৃষ্টির কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি ফ্লাইট, ফলে দেশটির বড় একটি অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনডব্লিউএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার (২৫ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া এই ঝড় আগামী কয়েক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিস্তৃত হবে। এতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে নেমে যাবে এবং ভ্রমণ ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। খবর আল জাজিরার।

রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৪ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১০ লাখ ৫ হাজার ৬৪১ জন গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেনেসি অঙ্গরাজ্য। এছাড়া মিসিসিপি, টেক্সাস, লুইজিয়ানা, কেন্টাকি, জর্জিয়া, ভার্জিনিয়া ও আলাবামায় ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।
এনডব্লিউএস জানিয়েছে, ওহাইও ভ্যালি থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ভারি তুষারপাতের আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে লোয়ার মিসিসিপি ভ্যালি থেকে মিড-অ্যাটলান্টিক ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ মাত্রায় বরফ জমে যাওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার আবহাওয়াবিদ অ্যালিসন সান্তোরেলি বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী ঝড়, কারণ এটি একই সঙ্গে অত্যন্ত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রভাব ফেলছে। তিনি জানান, প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের শীতকালীন আবহাওয়া সতর্কতার আওতায় রয়েছে। নিউ মেক্সিকো ও টেক্সাস থেকে শুরু করে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মাইল এলাকাজুড়ে এই ঝড়ের প্রভাব পড়ছে।
ঝড়টিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার (২৪ জানুয়ারি) প্রায় ২০টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, ঝড়ের গতিপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সবাইকে নিরাপদ ও উষ্ণ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ঝড়ের প্রভাবে রোববার দেশজুড়ে ১০ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং প্রায় ৮ হাজার ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটএওয়ার। বড় বড় এয়ারলাইন্স যাত্রীদের ফ্লাইট বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সচিব ক্রিস্টি নোয়েম জানান, ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (এফইএমএ) আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ত্রাণসামগ্রী, জনবল ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে, তাই নাগরিকদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও খাদ্য মজুত রাখার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
রোববার মার্কিন জ্বালানি বিভাগ একটি জরুরি আদেশ জারি করে মধ্য-আটলান্টিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড অপারেটর পিজেএম ইন্টারকানেকশনকে বিশেষ কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখার অনুমতি দেয়, যা প্রয়োজনে রাজ্য আইন বা পরিবেশগত বিধিনিষেধ অতিক্রম করতে পারবে।

এনডব্লিউএস সতর্ক করেছে, ভারি বরফ জমার কারণে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ব্যাপক গাছপালা ভেঙে পড়া এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক বা চলাচল অযোগ্য সড়ক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে—বিশেষ করে এমন অঙ্গরাজ্যগুলোতে, যেখানে সাধারণত এ ধরনের তীব্র শীত দেখা যায় না।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ঝড় কেটে যাওয়ার পরও নর্দার্ন প্লেইনস ও আপার মিডওয়েস্ট অঞ্চলে এক সপ্তাহ পর্যন্ত প্রাণঘাতী ঠান্ডা অব্যাহত থাকতে পারে। সেখানে বাতাসের সঙ্গে অনুভূত তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফ্রস্টবাইটের ঝুঁকি তৈরি করবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভয়াবহ ঝড়ের মূল কারণ ‘পোলার ভর্টেক্স’—মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহের বলয়ের বিকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের পোলার ভর্টেক্স অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এবং এর ফলে শীতকালীন ঝড় আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

