দীর্ঘ ১৬০ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসা নাটোরের লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় আজও জাতীয়করণের বাইরে থাকায় বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। ঐতিহ্য, ধারাবাহিক সাফল্য এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ না হওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের ভাষায়, “এটি এখন লালপুরবাসীর প্রাণের দাবি।”
পদ্মাবিধৌত লালপুরে ১৮৬৭ সালে পুঠিয়ার মহারাণী শরৎ সুন্দরী দেবী ‘শরৎ সুন্দরী মধ্য ইংরেজি স্কুল’ নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের পরিক্রমায় ১৯৩৫ সালে এটি ‘চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ এবং ১৯৪১ সালে ‘শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে।
১৯৩১ সালের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ১৯৩৪ সালে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলেও স্থানীয় জমিদার ও শিক্ষানুরাগীদের প্রচেষ্টায় ১৯৩৬ সালে পুনরায় পাঠদান শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে মূল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে পাইলট স্কিমভুক্ত এবং ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতির অনুদান লাভ করে বিদ্যালয়টি। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে এসএসসি (ভোকেশনাল), ২০০১ সালে এইচএসসি (বিএম) এবং ২০১২ সালে মডেল প্রকল্পভুক্ত হয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়।
শিক্ষা ও ক্রীড়া—উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যালয়টির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, স্কাউট ও বিএনসিসি কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও এ প্রতিষ্ঠানের ৬৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন, যাঁদের মধ্যে অনেকে শহীদ হন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, সরকারি নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করায় ২০১৭ সালে জাতীয়করণের তালিকায় থাকলেও রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটির নাম বাদ দেওয়া হয়। তাঁদের দাবি, এর পরিবর্তে তুলনামূলক কম যোগ্য একটি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়েছে।
সহকারী শিক্ষক শারমিন আক্তার জুথি বলেন, “ঐতিহ্য ও সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে আমাদের প্রাণের দাবি, লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হোক।”
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. অমল কুমার চৌধুরী বলেন, “এত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বাইরে থাকা সত্যিই দুঃখজনক।”
সাবেক শিক্ষার্থী ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমি এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, এখন আমার সন্তানও এখানে পড়ছে। এত পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠান এখনো জাতীয়করণ না হওয়ায় আমরা ব্যথিত।”
প্রধান শিক্ষক খাজা শামীম মো. ইলিয়াস হোসেন জানান, বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২৯৩ জন। শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে রয়েছেন ৪৫ জন। তিনি বলেন, “জাতীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করা হলেও রাজনৈতিক কারণে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।”
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সহকারী অধ্যাপক মো. সাজেদুল ইসলাম হলুদ বলেন, “দেড়শ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এ প্রতিষ্ঠানটি শুধু রাজনৈতিক কারণেই জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব হারুনার রশিদ পাপ্পু বলেন, “জাতীয়করণের তালিকায় নাম আসার পরও রাজনৈতিক কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত জাতীয়করণের দাবি জানাচ্ছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহ বলেন, “ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি সরকার চাইলে জাতীয়করণের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।”
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, “লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর গৌরবময় ইতিহাস ও অবদান বিবেচনায় এটি জাতীয়করণের দাবিদার। আমি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করব।”
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

