চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদীর তীরে প্রকৃতির এক নির্মম রূপ নয়, বরং মানুষের লোভের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। রাতের অন্ধকারে প্রভাবশালী একটি চক্রের অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধ এখন খাদের কিনারায়। মাত্র এক রাতের ব্যবধানে কয়েক একরের একটি জেগে ওঠা বালুচর ড্রেজার দিয়ে গিলে খেয়েছে বালু দস্যুরা। ফলে যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল শিশুদের কোলাহল, সেখানে এখন কেবলই গভীর জলের হাহাকার।
উপজেলার চরভৈরবী ইউনিয়নের ১ নম্বর গাজীনগর এলাকার বাসিন্দাদের কাছে নদী রক্ষা বাঁধসংলগ্ন বিশাল এই চরটি ছিল এক চিলতে শান্তির জায়গা। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় এলাকার শিশু-কিশোররা প্রতিদিন বিকেলে এখানেই ফুটবলের আসর জমাত। স্থানীয় বাসিন্দা দুলু মুন্সি আক্ষেপ করে বলেন, “সোমবার বিকেলেও ছাওয়ালপাওয়ালরা এই মাঠে বল খেলছে। সকালে আইসা দেখি মাঠটাই নাই! সব বালু তুইলা নিয়ে গেছে।” বালু উত্তোলনের ফলে সেখানে এখন গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, যা সরাসরি আঘাত হানছে মূল বাঁধে।
বালুচরটি বিলীন হওয়ায় বাঁধের গোড়া থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এতে যে কোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে বসতভিটা ও ফসলি জমি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেঘনার বুক থেকে বালু লুট করে আসছে। যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
অবৈধ এই কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে দ্রুত অভিযানে নামে প্রশাসন। হাইমচর থানা পুলিশ জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে সাতজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাইমচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানান, “মামলার পরপরই আমরা অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছি। বাকিদের ধরতেও অভিযান চলছে।”
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত রায় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ইউএনও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ভাঙন ঠেকাতে আপাতত স্টকে থাকা কংক্রিট ব্লক দিয়ে কাজ শুরু করা হচ্ছে। স্থায়ী সুরক্ষায় আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
স্থানীয়দের দাবি, কেবল সাময়িক মেরামত নয়, ড্রেজার সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে নদী রক্ষা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক। নতুবা মেঘনার করাল গ্রাসে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে গাজীনগরের জনপদ।
একুশে সংবাদ/যাবিদ



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

