ফরিদপুরের সালথা উপজেলা-র সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত কুমার-এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম-এর কাছে অভিযোগপত্রটি দাখিল করা হয়। অভিযোগে প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত কুমারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, শিক্ষার মান অবনতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় ব্যয় করছেন। তিনি পাশের বোয়ালমারি উপজেলার দাতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় সেই প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যালয়ে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারী পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
এছাড়া তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রায়ই ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সহকারী শিক্ষকসহ অন্যরা তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশের অবনতি ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এক সময় এলাকার অন্যতম সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি। ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থের যথাযথ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নেই বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের আগস্টে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব থেকে বকেয়া বেতনসহ মোট ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে ৭ লাখ ২২ হাজার ৮০২ টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন হিসেবে বিতরণ করা হলেও অবশিষ্ট ২ লাখ ৭৭ হাজার ১৯৮ টাকা বিদ্যালয়ের রাস্তা সংস্কার ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব কাজের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এছাড়া ২০২৪ সালে অডিট বাবদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য অস্বাভাবিক বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। একই বছরে বিজ্ঞানাগারের জন্য উপকরণ কেনার কথা বলে ৫৭ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো সরঞ্জাম কেনা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায়ও প্রধান শিক্ষক বেতন উত্তোলন করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে উত্তোলন না করলে সেই বেতন ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও পরে বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে তিনি প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এছাড়া ২০২১ সালে মাত্র ছয় মাস দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক সভাপতির ব্যাংক স্বাক্ষর এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষার সময় টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য কিছু শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের দাবি, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন এসে পুরো সপ্তাহের হাজিরা দেখিয়ে দেন। এতে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত কুমার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অধিকাংশ অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ব্যক্তিগত কারণে কিছু ব্যক্তি তাকে হয়রানি করতে এসব অভিযোগ করেছেন। তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

