AB Bank
  • ঢাকা
  • বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি ৩৯, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাড়ে ৯ লাখ মানুষ


Ekushey Sangbad
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০২:৪৯ পিএম, ১১ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি ৩৯, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাড়ে  ৯ লাখ মানুষ

টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৯ জন। একই সঙ্গে বিভাগের পাঁচ জেলায় প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে থাকায় জনজীবন, যোগাযোগ এবং ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে, যেখানে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙামাটিতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে জেলার ১৬টি উপজেলাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যার কবলে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যায় ৩৯ জনের প্রাণহানি, নয় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ২৩ হাজার ৮৫৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

সরকার বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা সংরক্ষিত রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এ দুই উপজেলায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রামসহ দেশের ৪ বিভাগে বন্যার আশঙ্কা

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম উপকূলীয় বহু এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহেও সমস্যা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশে এখনও পানি থাকলেও সীমিত আকারে যান চলাচল করছে। তবে পানি বৃদ্ধি পেলে আবারও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকটও দেখা দিয়েছে।

ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান জানান, ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ড পুরোপুরি পানির নিচে রয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া চাল এখনও পানিবন্দি অবস্থার কারণে এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনও পানিবন্দি লাখ মানুষ

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, চার লাখের বেশি মানুষ এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। উপজেলার প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় সড়ক ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী স্পিডবোট ব্যবহার করে দুর্গতদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নই বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নের পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার কাঁচাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক এলাকায় তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনও প্লাবিত। এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ৪৬ টন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৬ হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার বিতরণ করা হলেও কয়েকটি দুর্গম এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছানো যায়নি।

ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি ঢুকে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজারে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায়। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং বহু পরিবার রান্না করতেও পারছে না।

এদিকে ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধস ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে রাঙামাটির সাজেকে আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরাপদে উদ্ধার করেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে।

রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এসব জেলাকে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদিকে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন গ্রাম ও সড়ক প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন নতুন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে বাগেরহাটের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে মোংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।

বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, সরকার সার্বক্ষণিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছে।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। পাশাপাশি উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

 

একুশে সংবাদ/এ.জে

Link copied!