পূর্বাচলে আমাদের দাদা-নানার কবর ছিল সরকারি অধিগ্রহণের পর সব মুছে গেছে, এখন আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরও কি একই পরিণতি হবে? এমনই আতঙ্কের কথা জানান রঘুরামপুর গ্রামের মুজিবর রহমান খান।
একবার উচ্ছেদ হয়ে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়েছেন। নতুন করে জমি কিনে গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি বসতি। সেই আশ্রয়ও এবার হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া, কুলিয়াদি, রঘুরামপুর, শিমুলিয়া ও ব্রাহ্মণখালী এলাকার দুই শতাধিক পরিবারের।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যদের আবাসিক এলাকা নির্মাণের জন্য ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এলাকায় নতুন করে উচ্ছেদ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে প্রকল্পের জন্য সার্ভে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, বসতভিটা ও আবাদি জমি অধিগ্রহণ না করে অনাবাসিক, পতিত বা সরকারি খাস জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হোক।
সরেজমিনে দেখা যায়, এলাকাজুড়ে থমথমে পরিবেশ। সম্ভাব্য অধিগ্রহণের তালিকায় থাকা পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে। অনেকেই জানান, তারা পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের সময়ও উচ্ছেদের শিকার হয়েছিলেন।
তখন পূর্বপুরুষের কবরস্থান, বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে বাধ্য হয়ে আশপাশের এলাকায় নতুন করে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। এবার আবারও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজউকের পূর্বাচল উপশহর নির্মাণের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ৪২টি গ্রামের ১৭টি মৌজার ৬ হাজার ১৫১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সেই প্রকল্পে হাজারো পরিবার উচ্ছেদ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তাদেরই একটি অংশ ফুলবাড়িয়া, কুলিয়াদি,শিমুলিয়া, ব্রাহ্মণখালী ও রঘুরামপুরে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
বর্তমানে প্রস্তাবিত কোস্ট গার্ড আবাসন প্রকল্পে রঘুরামপুর মৌজার ১৯ দশমিক ২১ একর, ব্রাহ্মণখালী মৌজার ১৫ দশমিক ৮৫ একর এবং কুলিয়াদি মৌজার ৩ দশমিক ৭০ একর জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বসতবাড়ির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ কৃষিজমিও অধিগ্রহণের আওতায় পড়তে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। জমি হারালে শুধু বসতভিটাই নয়, জীবিকার প্রধান উৎসও হারিয়ে যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সহস্রাধিক মানুষ গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
রঘুরামপুর গ্রামের মুজিবর রহমান খান বলেন, পূর্বাচলে আমাদের দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সব মুছে গেছে। এখন আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরও কি একই পরিণতি হবে?
কুলিয়াদি গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০০০ সালে পূর্বাচল থেকে উচ্ছেদ হয়ে এখানে বসতি গড়েছিলাম। এক জীবনে দ্বিতীয়বার ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে।
ব্রাহ্মণখালীর মোস্তফা কামাল বলেন, বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান সবকিছু আবারও হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে মানুষের জীবনের ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়।
কুলিয়াদি গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, এই ফসলি জমিই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নামমাত্র মূল্যে জমি অধিগ্রহণ করা হলে আমরা সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাব। প্রয়োজনে রক্ত দেব, কিন্তু বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছাড়ব না।
পূর্বাচল থেকে উচ্ছেদ হয়ে রঘুরামপুরে বসতি গড়া মহসিন মিয়া বলেন, তিন শতক জমির ওপর নতুন করে সংসার গড়েছিলাম। এখন সেটিও হারানোর শঙ্কায় আছি। মনে হচ্ছে ভাগ্য বারবার আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। শিমুলিয়ার বৃদ্ধ আব্দুল মতিন বলেন, বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তা দিয়ে এখন অন্য কোথাও এক টুকরো জমিও কেনা সম্ভব নয়।
আলমপুর গ্রামের মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন বলেন, যারা বসতবাড়ি হারাবে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি বিধান অনুযায়ী বাস্তব বাজারমূল্যের ভিত্তিতে যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান জানান, রঘুরামপুর ও কুলিয়াদি এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ ভোটার রয়েছেন।
পূর্বাচল রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ-আল-সোহান বলেন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যদের আবাসিক এলাকা নির্মাণের জন্য ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে এক মাস আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ হলে আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুসরণ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী ভূমির ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কেউ তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষা করে বিকল্প হিসেবে সরকারি খাস জমি বা অনাবাসিক পতিত জমি নির্বাচন করা উচিত। তাদের মতে, এতে একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, অন্যদিকে শত শত পরিবারের জীবন-জীবিকা ও বসতভিটাও রক্ষা পাবে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

