AB Bank
  • ঢাকা
  • সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

বন্যা-পাহাড়ধসে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি বিপর্যয়ের নেপথ্যে কী


Ekushey Sangbad
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৪:৩১ পিএম, ১৩ জুলাই, ২০২৬

বন্যা-পাহাড়ধসে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি বিপর্যয়ের নেপথ্যে কী

অতি ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ধারাবাহিক পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।

এ পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড়ধসে অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। 
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন। অধিকাংশ এলাকায় বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা উঁচু স্থানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামে মারা গেছেন ১৩ জন, বান্দরবানে ৬জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জন। এই বিপুল প্রাণহানির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এবারের বন্যা ও পাহাড়ধস এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠলো?

বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের দুর্যোগের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ৪৩ বছরের রেকর্ড ভাঙা অতিভারী বৃষ্টিপাত।

একদিনেই সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ভারতের ত্রিপুরা ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। সাঙ্গু, শঙ্খ ও ডলু নদীর পানি দ্রুত বিপৎসীমা অতিক্রম করে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে।

অতিভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে অন্তত ৯৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ও অবৈধ বসতিগুলোর ওপর মাটি ধসে পড়ায় বহু মানুষ প্রাণ হারান। 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা, মাইকিং এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও অনেক বাসিন্দা নিজ বাড়ি ছাড়তে রাজি হননি। ফলে বাড়িঘর ধসে পড়া কিংবা আকস্মিক ঢলের পানিতে আটকা পড়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণও এবারের দুর্যোগকে আরও মারাত্মক করেছে। দীর্ঘদিন ধরে খাল, নালা ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতায় অনেক এলাকায় কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয় এবং পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়।

উদ্ধার কার্যক্রমও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যার পানিতে সড়ক, সেতু এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের বিভিন্ন অংশ ডুবে যাওয়ায় বহু এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দল এবং ত্রাণসামগ্রী সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দুর্গম এলাকায় পর্যাপ্ত নৌযানের অভাবও উদ্ধারকাজে বিলম্বের কারণ হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। কয়েক লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি।

হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে রয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় বহু পরিবার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছে না। উপকূলীয় এলাকায় অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে এবং বহু পাকা বাড়ির নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঁচ জেলায় ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।

দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় আগাম সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে। তবে তারা স্বীকার করেছেন, প্রশাসনের অনুরোধ সত্ত্বেও অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ায় প্রাণহানি বেড়েছে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে শুধু উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে অবৈধ বসতি সরানো, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ পুনরুদ্ধার, কার্যকর নগর পরিকল্পনা, আগাম সতর্কবার্তা বাস্তবায়ন এবং আশ্রয়কেন্দ্রমুখী জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও ঘন ঘন এবং আরও প্রাণঘাতী বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

 

একুশে সংবাদ/ওজি

Link copied!