‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’ স্লোগানের মধ্যদিয়ে আজ রোববার আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস পালিত হচ্ছে। তবে সচেতনতার এই বার্তার মধ্যেও বাংলাদেশে বজ্রপাত ক্রমেই বড় জননিরাপত্তা হুমকিতে রূপ নিচ্ছে। এতে বেশি মরছে হাওর অঞ্চলের কৃষক।
আর বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। তবে এ থেকে উত্তরণে তালগাছ প্রাকৃতিক ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রপাত নিরোধক হিসেবে কাজ করে। এর উচ্চতা ও বিশেষ শারীরিক গঠনের কারণে এটি চারপাশের বজ্রপাত নিজের দিকে আকৃষ্ট করে মাটিতে পৌঁছে দেয়, যা খোলা মাঠে মানুষ ও গবাদিপশুকে মারাত্মক মৃত্যুঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
জানা গেছে, তালগাছ সাধারণত অনেক উঁচু হয়ে থাকে। এর উচ্চতা অনেক সময় আশপাশের অন্যান্য গাছ বা স্থাপনার চেয়ে বেশি হয়। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত হানে। তালগাছ সেই বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরের মাধ্যমে মাটির গভীরে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে আশপাশের মানুষ বা ছোট গাছপালা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাত যখন ঘটে; তখন আকাশে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক চার্জ দ্রুত মাটিতে নামার পথ খোঁজে। উঁচু ও সোজা গাছ সেই চার্জের জন্য সহজ পথ তৈরি করে। তালগাছের গঠন এমন যে, এটি বিদ্যুৎকে মাটিতে প্রবাহিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগে রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং গ্রামাঞ্চলে প্রচুর তালগাছ দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ গাছের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। শুধু তালগাছ নয়, অন্য গাছও ভূমিকা রাখে। তালগাছের পাশাপাশি নারিকেল, সুপারি, বটগাছসহ কিছু উঁচু গাছও বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ করে বটগাছের বিস্তৃত শেকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকে, যা বিদ্যুৎ পরিবাহিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে তালগাছের উচ্চতা ও গঠন একে বিশেষভাবে কার্যকর করে তোলে। নারিকেল ও সুপারি গাছ উপকূলীয় এলাকায় বেশি দেখা যায়। এসব গাছও অনেক উঁচু হয় এবং বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ নিজের শরীরে গ্রহণ করতে পারে। তবে এগুলো কোনো ‘নিশ্চিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ নয়; বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ। অনেকেই ভুল করে মনে করেন, বজ্রপাতের সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলে নিরাপদ থাকা যায়। বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বজ্রপাত সরাসরি গাছের ওপর আঘাত করলে সেই বিদ্যুৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছের নিচে থাকা মানুষ গুরুতর আহত বা নিহত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতের সময় কখনোই তালগাছ, নারিকেল গাছ, বটগাছ কিংবা অন্য কোনো উঁচু গাছের নিচে দাঁড়ানো উচিত নয়। অনেক সময় বজ্রপাতের তাপে গাছ ফেটে যায়, ডাল ভেঙে পড়ে বা আগুন ধরে যায়। তাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। যেমন- দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান। বজ্রপাত শুরু হলে যত দ্রুত সম্ভব পাকা ঘর বা নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠ, নদী, হাওর বা উঁচু জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। মোবাইল ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকুন। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই ভালো। টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার বা তারযুক্ত ফোন থেকে দূরে থাকতে হবে। গাছের নিচে আশ্রয় নেবেন না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। বড় গাছ বজ্রপাত আকর্ষণ করতে পারে। তাই গাছের নিচে দাঁড়ানো বা বসা বিপজ্জনক। পানিতে থাকা থেকে বিরত থাকুন। নদী, পুকুর বা খালে গোসল করা কিংবা মাছ ধরা বজ্রপাতের সময় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাঠে থাকলে নিচু হয়ে বসুন। যদি খোলা মাঠে আটকা পড়েন, তাহলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে। তবে মাটিতে পুরো শরীর শোয়ানো যাবে না। তালগাছ শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধেই নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহ্যে তালগাছের উল্লেখ বহুবার এসেছে। গ্রামবাংলার রাস্তার ধারে সারি সারি তালগাছ একসময় ছিল খুব পরিচিত দৃশ্য। তালের ফল পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়। তাল দিয়ে পিঠা, পায়েস, বড়া ও বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি হয়। তালপাতা দিয়ে তৈরি হতো হাতপাখা, ছাউনি ও নানা গৃহস্থালি সামগ্রী। অর্থাৎ তালগাছ পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
গত ১২ বছরে দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরে গড়ে ৩০০–৩৫০ জনের বেশি মানুষ এ দুর্যোগে মারা যাচ্ছেন। উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তি ও সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু হলেও মাঠপর্যায়ে প্রাণহানি কমানোর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে সময়মতো মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের হাওরাঞ্চল। বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর, মৌসুমি কৃষিকাজ, জলাভূমিনির্ভর জীবিকা, উন্মুক্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এখন বজ্রপাতের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরিবর্তিত মৌসুমি আচরণ এবং সীমিত প্রস্তুতির কারণে এসব এলাকায় বজ্রপাতজনিত প্রাণহানির ঝুঁকি অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি রয়ে গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) তথ্য ও বৈশ্বিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে ৮২ দশমিক ৪৪টি বজ্রপাত ঘটে। বিশ্বের কিছু দেশে বজ্রপাতের ঘনত্ব আরও বেশি হলেও উন্নত অবকাঠামো, কার্যকর আগাম সতর্কতা ও নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থার কারণে প্রাণহানি তুলনামূলক কম। যার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। এখানে বজ্রপাতের ঘনত্ব বেশি হলেও উন্নত অবকাঠামো, আগাম সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে খুব কম। বিপরীতে বাংলাদেশে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
সংশ্লিষ্ট গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোট মৃত্যুর সংখ্যায় বড় আয়তনের দেশ ভারত এগিয়ে থাকলেও আয়তনের তুলনায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুঝুঁকিতে বাংলাদেশ উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রতি ১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহারে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে রয়েছে।
কথা হয় গবেষণা করা রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (রাইমস) গবেষক গোলাম রাব্বানী এর সঙ্গে। তিনি জানান, একক কোনো স্থানের হিসাব বিবেচনায় বৈশ্বিকভাবে ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবো (বছরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩৩টি ফ্ল্যাশ নিয়ে) বিশ্বের সর্বোচ্চ বজ্রপাতঘন অঞ্চলগুলোর একটি। আর বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা, যেখানে বার্ষিক ফ্ল্যাশের সংখ্যা ১০৩। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে। বিপরীতে দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলা তুলনামূলক কম বজ্রপাতপ্রবণ। গবেষকদের ভাষায় এগুলো ‘কোল্ডস্পট’। সবচেয়ে কম বজ্রপাত হয় ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝিনাইদহ জেলায়। উপজেলা হিসেবে রাজাপুর, কাঁঠালিয়া ও মঠবাড়িয়াকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক যুগে দেশে বজ্রপাতে মোট ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন, ২০২৫ সালে ২৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত ১৩২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমতির দিকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও প্রবণতা কমছে নাকি বাড়ছে—এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো গবেষণা ও আলোচনা চলছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অনেক কথা প্রচলিত যার বেশিরভাগেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং ভুল তথ্য ও আচরণের কারণে অনেক মানুষ সময়মতো নিরাপদ আশ্রয় না নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যান। তাদের মতে, বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কবার্তার পাশাপাশি কুসংস্কার ভেঙে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, দেশে বজ্রপাত সারা বছরই কমবেশি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ এই সময়ে ঘটে। অন্যদিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঘটে প্রায় ৫১ শতাংশ বজ্রপাত। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে এ হার প্রায় ৮ শতাংশ এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২-৩ শতাংশ। তিনি বলেন, সংখ্যায় কম হলেও মার্চ থেকে মে সময়ের বজ্রপাত তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী হয়ে থাকে। তবে আবহাওয়াবিদদের নতুন উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু মহাশাখার উপপরিচালক ড. রাশেদুজ্জামান বলেন, আগে বজ্রপাতের প্রকোপ মূলত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বেশি থাকলেও ২০১৬ সালের পর থেকে বর্ষা মৌসুমেও বজ্রপাতের প্রবণতা ও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বায়ু এবং উত্তর দিকের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বায়ুর পারস্পরিক ক্রিয়ায় বড় আকারের বজ্রমেঘ তৈরি হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি বাড়ায় এই প্রক্রিয়ার তীব্রতাও বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ সেখানকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। বিশাল খোলা মাঠ এবং দিগন্ত বিস্তৃত এলাকায় বড় গাছপালা বা নিরাপদ স্থাপনা কম থাকায় খোলা পরিবেশে কাজ করা মানুষ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এই ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন সময়ে মাঠপর্যায়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেক স্থানে এসব ব্যবস্থা প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে পারছে না
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে স্থাপন করা কিছু বজ্রনিরোধক দণ্ড কারিগরি সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি অথবা অবস্থানগত কারণে কার্যকর নেই। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকার এখন হাওর ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ‘কৃষক ছাউনি কাম লাইটনিং অ্যারেস্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, এটি মূলত একটি পাকা বা অর্ধ-পাকা আশ্রয়স্থল, যার সঙ্গে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকবে, যাতে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকেরা ঝড়-বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় দ্রুত সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন। একইসুরে কথা বলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার। তিনি বলেন, নতুন করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বজ্রনিরোধক দণ্ডের কার্যকারিতা সীমিত এলাকায় কাজ করে। তাই শুধু এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তবে সুখবর হচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) প্রযুক্তিগত সহায়তায় স্যাটেলাইট ও সেন্সরভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারছে।
কথা হয় রাইমসের বিশেষজ্ঞ গোলাম রাব্বানী এর সঙ্গে। তিনি বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে ১ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরকারি প্ল্যাটফর্মে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাপানের হিমায়ারি–৯ স্যাটেলাইটের তথ্যও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো এই পূর্বাভাস সময়মতো প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ হাওরাঞ্চলের কৃষক বা জেলেদের অনেকের কাছেই নিয়মিত স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সুবিধা থাকে না। তিনি আরও বলেন, রাডার ও প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্য সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী করে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বয়ংক্রিয় সাইরেন, অ্যাপভিত্তিক পপ-আপ সতর্কবার্তা বা অবস্থানভিত্তিক বার্তা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, এখন ১ থেকে চার ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও সেটি মানুষের কাছে না পৌঁছালে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। এমন অবস্থায়, দেশের বড় জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে গণমাধ্যম ও সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

