দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের প্রথম বাজেট এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান পূরণে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘাটতি। এই অর্থের একটি অংশ বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এবং বাকিটা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
উন্নয়ন ও ভর্তুকিতে বড় বরাদ্দ
নতুন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি নিজস্ব উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা ও প্রকল্প ঋণ থেকে আসবে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এবং আয়কর ও মূলধনী মুনাফা কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক এবং অন্যান্য উৎস থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে
নতুন কর কাঠামোর কারণে সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কাজুবাদাম, আমদানিকৃত হিমায়িত মাছ, বিদেশি প্রসাধনী এবং নির্মাণসামগ্রী এমএস রডের ওপর কর বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
দেশীয় অ্যালকোহল উৎপাদনেও নির্দিষ্ট হারে কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বস্তি পেতে পারেন ভোক্তারা
দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পকে উৎসাহ দিতে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার উৎপাদনে ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ উৎপাদনে বিদ্যমান কর সুবিধাও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ
প্রথমবারের মতো ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরবর্তী দুই করবর্ষে তা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হবে এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের জন্য পৃথকভাবে উচ্চতর করমুক্ত আয়সীমার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা আয় করমুক্ত রাখার সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি কর
নতুন কর কাঠামোতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য বিদ্যমান প্রগতিশীল ব্যবস্থা বহাল থাকলেও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত করহার কার্যকর হবে। সরকারের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি কর নীতির মাধ্যমে করব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং পূর্বানুমানযোগ্য করা সম্ভব হবে।
নতুন বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিকে সরকার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

