একসময় গ্রামবাংলার মেঠোপথ, বাড়ির আঙিনা, খেতের আইল কিংবা বনজঙ্গলে সহজেই চোখে পড়ত ডেউয়া গাছ। গ্রীষ্মের শুরুতে গাছভর্তি হলুদ রঙের ডেউয়া ফলের টক-মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। শিশু-কিশোরদের কাছে এটি ছিল অন্যতম আকর্ষণীয় দেশীয় ফল। অঞ্চলভেদে ডেউয়া, ঢেউয়া, মাদার কিংবা বনকাঁঠাল নামে পরিচিত এ ফল সময়ের বিবর্তন, বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউনিয়নের মমিনপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি পুরোনো টিনের চালাঘরের ওপর বিস্তৃত হয়ে আছে একটি ডেউয়া গাছ। বড় বড় পাতার আড়ালে ডালজুড়ে থোকায় থোকায় ঝুলছে ডেউয়া। কচি কাঁঠালের মতো ছোট ছোট গুচ্ছবদ্ধ ফল কোথাও চার-পাঁচটি, কোথাও আবার দু-একটি করে ঝুলে আছে। কয়েকটি পাকা হলুদ ফল মাটিতেও ঝরে পড়েছে। দেখতে ডেউয়া অনেকটা ছোট কাঁঠালের মতো।
একসময় গ্রামীণ জনপদে নানা গাছের ভিড়ে ডেউয়া গাছ ছিল সহজেই চোখে পড়ার মতো। মৌসুম এলেই থোকায় থোকায় কাঁচা ও পাকা ফলে ভরে উঠত গাছ। কিন্তু ফলটির পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার অভাব, বনভূমি উজাড় এবং দেশীয় ফলের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় এটি এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। শহরে এ ফলের দেখা পাওয়া এখন দুর্লভ, এমনকি অনেক গ্রামেও ডেউয়া গাছ আর চোখে পড়ে না।
ধনবাড়ীতে ফলটি ‘ডেউয়া’ নামে পরিচিত হলেও বিভিন্ন এলাকায় এটি ঢেউয়া, মাদার, ডেউফল, ঢেউফল, বনকাঁঠাল ও বত্তা নামে পরিচিত। ফলটি আকারে গোলাকার ও এবড়োখেবড়ো, সাধারণত ২ থেকে ৫ ইঞ্চি ব্যাসের হয়। প্রতিটি ফলের ওজন প্রায় ২০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম। গাছে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা হয় এবং স্ত্রী ফুল থেকেই ফল ধরে। ফল কাঁঠালের মতো গুচ্ছ বা যৌগিক প্রকৃতির। পাকলে ভেতরে কাঁঠালের মতো কোষ তৈরি হয়। প্রতিটি ফলে ২০ থেকে ৩০টি কোষ ও বীজ থাকে। বীজের চারপাশের মাংসল অংশ খাওয়ার উপযোগী। পাকা কোষ নরম ও মোলায়েম, যার রং লালচে-হলুদ। কাঁচা অবস্থায় ফলের স্বাদ টক, আর পাকলে তা টক-মিষ্টি হয়ে ওঠে। ডেউয়া কাঁচা কিংবা রান্না করেও খাওয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ ফল জন্মে।
একসময় গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এই দেশীয় ফল আজ স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, দেশীয় ফলের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে ডেউয়াসহ দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণ ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

