AB Bank
  • ঢাকা
  • রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী
রূপগঞ্জে বেড়িবাঁধের ভেতর কৃত্রিম জলাবদ্ধতা

খাল দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে বছরের পর বছর পানিবন্দী হাজারো মানুষ



খাল দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে বছরের পর বছর পানিবন্দী হাজারো মানুষ

সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায় রাস্তা, উঠান ও ঘরবাড়ি। স্কুল-কলেজে যেতে পারে না শিক্ষার্থীরা, ব্যাহত হয় ব্যবসা-বাণিজ্য। বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি বাড়ছে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি। বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ যেন রূপগঞ্জ উপজেলার বেড়িবাঁধ এলাকার কয়েক হাজার মানুষের নিত্যসঙ্গী।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন ও তারাবো পৌরসভার কাঞ্চন, কালাদী, নলপাথর, ডুলুরদিয়া, টেকপাড়া এবং কান্দাপাড়া, মাসাবো, তেঁতলাবো, শান্তিনগর, বাগানবাড়ি, যাত্রামুড়া, রূপসী; এছাড়া মুড়াপাড়া, ভুলতা ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আউখাবো, বলাইখা, আমলাব, গোলাকান্দাইল মধ্যপাড়া, নতুনবাজার, পাঁচ নম্বর ক্যানেল, টেলাপাড়া, হাটাব, বারুইপাড়া ও পিঠাঘুড়ি এলাকাসহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি গ্রামের মানুষ প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন।

১৯৮৪ সালে ৯০ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অগ্রণী সেচ প্রকল্প-১ এবং পরে ১৯৯৩ সালে ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ের ৫ হাজার হেক্টর জমি ঘিরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের কয়েক বছর পর থেকেই এখানে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দুর্ভোগও।

নব্বইয়ের দশকের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রণী প্রকল্প এলাকার ভেতরে মিল-কারখানা গড়ে উঠলে এটি আবাসিক ও শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়। তখন থেকেই মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। বসতি ও কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবছর বাড়ছে জলাবদ্ধতাও। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, খাল দখল ও ভরাটের ফল। অপরিকল্পিত সেচ প্রকল্প, দখল ও দূষণে ভরাট হয়ে যাওয়া খাল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং অচল পাম্পমেশিন এই দুরবস্থার প্রধান কারণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে জাইকার অর্থায়নে পানি নিষ্কাশন ও কৃষি সেচ সুবিধার জন্য বানিয়াদী থেকে গোলাকান্দাইল এবং কাঞ্চন-কালাদী থেকে গোলাকান্দাইল পর্যন্ত দুটি প্রধান খাল খনন করা হয়। পাশাপাশি সুতালরির খাল, দাগিরমার খাল, মাউচ্চা বিলের খাল, কানী বিলের খাল ও টাটকির খালসহ কয়েকটি শাখা খালও খনন করা হয়। বানিয়াদী এলাকায় স্থাপন করা হয় একটি সুইস গেট ও চারটি সেচ পাম্প, যাতে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচ নিশ্চিত করা যায়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব খালের বড় অংশ অবৈধ দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কাঞ্চন-কালাদী থেকে গোলাকান্দাইল পর্যন্ত প্রধান খালের একটি বড় অংশ ভরাট করে ঢাকা বাইপাস সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। কাঞ্চন দক্ষিণ বাজারের উকিলবাড়ি এলাকার প্রশস্ত খালের ওপর গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। টেকপাড়া থেকে পিঠাঘুড়ি পর্যন্ত শাখা খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বাগানবাড়ি। ডুলুরদিয়া এলাকায় খালের মধ্যে বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। বানিয়াদী সুইস গেট থেকে গোলাকান্দাইল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা, বর্জ্য ও অবৈধ স্থাপনার কারণে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গোলাকান্দাইল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত অংশেও দখল ও ভরাটের কারণে পানি চলাচল স্বাভাবিক নেই। এছাড়া টাটকির, সুতালরির ও দাগিরমার খালের বিভিন্ন অংশ শিল্পকারখানার দখলে চলে গেছে। অনেক কারখানার দূষিত বর্জ্য খালে ফেলা হচ্ছে। এশিয়ান বাইপাস সড়কের পাশে গড়ে ওঠা একাধিক বালুর গদির পানি বর্ষার সময় আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

কাঞ্চনের কালাদী এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই আমাদের বাড়ির উঠানে পানি উঠে যায়। অনেক সময় তিন থেকে চার দিন পানি নামতে চায় না। ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হয়।’

নরাবো এলাকার বাসিন্দা নুর বানু বলেন, ‘বাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। খাবার রান্না করা কঠিন হয়ে পড়ে। মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ে, শিশুদের ডায়রিয়া ও চর্মরোগও দেখা দেয়।’

গোলাকান্দাইলের নতুনবাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান বলেন, ‘খালগুলো যদি আগের মতো সচল থাকত, তাহলে এত জলাবদ্ধতা হতো না। দখলদারদের কারণে পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।’

হাটাব এলাকার কৃষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জলাবদ্ধতায় কৃষিজমি দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকে। ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

টেলাপাড়া এলাকার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার জানায়, ‘বৃষ্টি হলেই স্কুলে যেতে সমস্যা হয়। অনেক সময় রাস্তায় হাঁটুসমান পানি থাকে। বই-খাতা নিয়ে যাওয়া যায় না।’

স্থানীয়দের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে অবৈধ বালু ভরাট বন্ধ করতে হবে, দখল হওয়া সরকারি খাল উদ্ধার করে পুনঃখনন করতে হবে এবং যেখানে খাল বিলীন হয়ে গেছে, সেখানে বিকল্প পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে খালের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নিয়মিত খাল পরিষ্কার, সেচ পাম্প ও সুইস গেট সচল রাখা এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণ করা খালগুলো উদ্ধার করে পুনঃখননের মাধ্যমে বানিয়াদী খালের সঙ্গে সব শাখা খালের সংযোগ পুনঃস্থাপনের দাবি তাদের।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। তারা স্বেচ্ছায় খালের ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে অভিযান পরিচালনা করেছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ না হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।’

বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগে পড়া রূপগঞ্জের এসব এলাকার মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা—সাময়িক অভিযান নয়, খাল উদ্ধার, পুনঃখনন এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হোক।

 

একুশে সংবাদ/এ.জে

সর্বোচ্চ পঠিত - সারাবাংলা

Link copied!