টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর একাধিক প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে জেলার চার উপজেলায় আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে ডুবে রাজনগরে আশরাফ আলী (৬৫) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ভাঙারহাট-আকুয়া এলাকার রিং বাঁধসংলগ্ন স্থান থেকে নিখোঁজ আশরাফ আলীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করেন স্বজনরা।
এদিকে বন্যার পানিতে আউশ ধানের ক্ষেত, শীতকালীন সবজি ও মাছের খামারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও গোখাদ্যের সংকট। তারাপাশা-টেংরা সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, শুক্রবার মনু নদীর চাঁদনীঘাট পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত পানি বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিকেল ৫টায় তা কমে বিপৎসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ধলাই নদীর উজানে পানি কিছুটা কমলেও মনু নদীর অববাহিকা ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা। মনু নদীর বাঁধ ভেঙে টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুরসহ কয়েকটি গ্রাম এবং ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে আরও প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ইতোমধ্যে ৯৫টি পরিবারকে মাইজগাঁও দাখিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর ও শিকড়া গ্রামের বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শিকড়া, আলিনগর ও ধামুলিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে এসব এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে।
কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর বাঁধে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেওয়ায় ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শমশেরনগর, পতনউষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়ছে। হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরের পানিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বিপুল সিকদার বলেন, "টেংরা, কামারচাকসহ কয়েকটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।"
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ জানান, মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের আরও চার থেকে পাঁচটি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতকাজ চলছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, জেলার চারটি উপজেলার ৪ হাজার ১৭৫টি পরিবার বর্তমানে পানিবন্দি। দুর্গতদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে এবং জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, "দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।"
শুক্রবার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগরের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন। একই দিনে কমলগঞ্জে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
এদিকে চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জানানো হয়, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন করে এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার সাত উপজেলায় মোট ১ হাজার ৭৫০ ব্যাগ শুকনো ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

