টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার অন্তত ৩০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও ঘরের চাল পর্যন্ত পানি উঠেছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কৃষিজমি, সবজি ক্ষেত ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা ব্যাহত হয়েছে।
উপজেলা সদর থানার মাত্র ৫০ ফুট দূরে আলীমুদ্দিন পাড়ার প্রায় ২০টি পরিবার তিন দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছে। ঝিরির পাশে হওয়ায় প্রতিবছরই এ এলাকায় পানি ওঠে, তবে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে এবার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
১২ বছর বয়সী ইয়ানুর আক্তার তিন দিন ধরে স্কুলে যেতে পারছে না। তার ভাই মুনতাহা ইসলাম ও মোস্তাকিম ইসলাম মায়ের সঙ্গে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বাবা না থাকায় মা রশিদা বেগমের সঙ্গেই তাদের বসবাস। পরিবারের আরেক সদস্য হাসানও পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয় নেওয়া বাড়িতেও হাঁটুসমান পানি।
হাসান বলেন, "তিন দিন ধইরা দোজখে আছি। রান্না করতে পারি না, গোসলও করতে পারি না। ঘর পানিতে ডুবে গেছে। ঘরের ভেতরের কিছুই বের করতে পারিনি। যা ছিল সব পানির নিচে চলে গেছে।"
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে আলীমুদ্দিন পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ পানি জমেছে।
শুধু আলীমুদ্দিন পাড়া নয়, উপজেলার চৈক্ষ্যং ফুটের ঝিড়ি, শিবাতলী, রোয়াম্ভু, সূর্যমনি কারবারী পাড়া, আবু মেম্বার পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষও টানা তিন দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছেন। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছে। ঘরবাড়ি ও দোকানে পানি ওঠায় নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র এবং কৃষিজমির সবজি ও অন্যান্য ফসল।
শিবাতলীর বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, নদীর তীরবর্তী হওয়ায় তাদের এলাকা প্রথমেই প্লাবিত হয়। সোমবার থেকে পানি বাড়তে শুরু করে। বৃষ্টি যত বেড়েছে, পানিও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে পানি কিছুটা কমলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও এলাকা প্লাবিত হয়।
শুক্রবার সকালে নিজের ঘর থেকে পানি সেচতে দেখা যায় মোহাম্মদ হোসেনকে। তিনি বলেন, বুধবার কিছুটা পানি উঠলেও পরে কমে গিয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার ভোর থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তেই ঘরে পানি ঢুকে পড়ে।
তিনি বলেন, "প্রতিবারই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হই। একটু ঘুরে দাঁড়াতেই আবার ঘর আর ফসল ডুবে গেল। গতকাল সারাদিন কিছু খেতে পারিনি। রাতে উপজেলা প্রশাসন যে খাবার দিয়েছে, সেটাই খেয়েছি। এখন ঘরে কিছুই নেই। আল্লাহ জানেন কীভাবে দিন কাটবে।"
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণে এবার আলীকদমে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে নয়াপাড়া, আব্বাস কারবারী পাড়া, রোয়াম্ভু, খুইল্লা মিয়া পাড়া, বুলু কারবারী পাড়া, মোস্তাক পাড়া, সদর হিন্দুপাড়া, বাজার মার্মা একাংশ, বাজারপাড়া, সাবের মিয়া পাড়া, থানাপাড়া, আলীমুদ্দিন পাড়া, নাছির মাস্টার পাড়া, ইচাক পাড়া, ওবাইদুল হাকিম পাড়া, মংচি হেডম্যান পাড়া, আমতলী লংঘাট, ফুটের ঝিড়ি, বটতলী পাড়া, শিবাতলী ও রেপারপাড়াসহ অন্তত ৩০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বন্যাকবলিত এলাকা পৃথকভাবে পরিদর্শন করেন আলীকদম জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে তাৎক্ষণিক খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। কারও ঘরবাড়ি, আবার কারও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

