হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন আলুচাষি, সংরক্ষণকারী ও ব্যবসায়ীরা।
ভাড়া বৃদ্ধির কারণে চাষি ও ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন দাবি করে তারা অবিলম্বে সংরক্ষণ ভাড়া কমানোর দাবি জানান। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
রোববার (২১ জুন) বেলা ১১টায় জয়পুরহাট- বগুড়া মহাসড়কের কালাই পৌরশহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় উপজেলা ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল অর্গানাইজেশন (আলু)-এর ব্যানারে প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা তিন শতাধিক আলুচাষি ও ব্যবসায়ী অংশ নেন।মানববন্ধন শেষে তারা কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, জয়পুরহাট জেলায় মোট ১৯টি হিমাগারের মধ্যে ১২টিই কালাই উপজেলায় অবস্থিত। দেশের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে কালাইয়ের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। অথচ এবার হিমাগার মালিকরা সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ ভাড়া বৃদ্ধি করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই উপজেলার চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
উপজেলা ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল অর্গানাইজেশন (আলু)-এর সভাপতি এ কে এম রেজাউল ইসলাম বলেন, প্রতি ৬০ কেজি আলুর বস্তা সংরক্ষণে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।এতে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে প্রায় ৬ টাকা ৯০ পয়সা খরচ হচ্ছে। উৎপাদন খরচ,শ্রমিক মজুরি, সার,বীজ,সেচ ও পরিবহন ব্যয় যোগ করলে প্রতি কেজি আলুর খরচ ২২ থেকে ২৩ টাকার নিচে থাকে না। অথচ বর্তমানে বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টাকায়। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মক লোকসানের শিকার হচ্ছেন।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, শুধু অন্য জেলার তুলনায় নয়, জয়পুরহাট জেলার অন্যান্য উপজেলার তুলনায়ও কালাইয়ের হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকার মধ্যে ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি। গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা আলু ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ রেখেছি। দ্রুত সমাধান না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
আঁওড়া মহল্লার আলুচাষি আবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আলু চাষ করে আমরা আজ দিশেহারা। উৎপাদন খরচই উঠছে না। যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক আলুর চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
একই দাবিতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার জিন্দারপুর ইউনিয়নের মোলামগাড়ীহাট নর্থপোল কোল্ড স্টোরেজের সামনেও পৃথক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা কৃষক, সংরক্ষণকারী ও ব্যবসায়ীগণের ব্যানারে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে আড়াই শতাধিক কৃষক, সংরক্ষণকারী ও ব্যবসায়ী অংশ নেন।
এ সময় বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি মো. তাজমিনুর রহমান, ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা, রেজাউল ইসলাম, বুলবুল আহমেদ, কৃষক আবুল আলিম, রিপন আহম্মেদ ও সংরক্ষণকারী কামাল হোসেনসহ অনেকে। বক্তারা বলেন, আলু উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এর ওপর অতিরিক্ত সংরক্ষণ ভাড়া কৃষকদের আরও বিপদে ফেলেছে।তবে হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, “সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। বর্তমানে হিমাগারগুলো ৬ টাকা ৫০ পয়সা হারে ভাড়া নিচ্ছে। এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে।
কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম আরা বলেন, চাষি ও ব্যবসায়ীদের স্মারকলিপি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। হিমাগার কর্তৃপক্ষ যদি শুরুতেই ভাড়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানাতো, তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় গত বছরের মতো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাড়া নির্ধারণের জন্য হিমাগার মালিকদের অনুরোধ করা হয়েছে।
কালাই থানার তদন্ত পরিদর্শক দীপেন্দ্রনাথ সিংহ জানান,মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।
এদিকে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধির কারণে কালাইয়ের হাজার হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ীর মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কৃষকরা আলু চাষে আগ্রহ হারাবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

