‘চা শিল্পের উন্নতি, সবুজ হোক অর্থনীতি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবস উদযাপন করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ চা বোর্ডের উদ্যোগে শনিবার (২০ জুন) শ্রীমঙ্গলস্থ জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সকাল ১১টায় পায়রা উড়িয়ে এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।
উদ্বোধনী পর্বের পর চা শিল্পবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিজিবি শ্রীমঙ্গল সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল বি এম তৌহিদ হাসান, বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান টি রহমান, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শাহ মঈনুদ্দিন হাসান, টি প্লান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিপিটিএবি) এর সভাপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ বটলিফ টি ফ্যাক্টরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিয়াজ আলী চিশতী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে চা শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন ও চা শ্রমিক প্রতিনিধিরা আলোচনা সভায় অংশ নেন।
আলোচনা শেষে দেশের চা শিল্পে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটটি ক্যাটাগরিতে ‘জাতীয় চা পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ‘শ্রেষ্ঠ বটলিফ চা কারখানা’ ক্যাটাগরিতেও বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার অর্জন করে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান। এ চা বাগানের কর্ণধার মহসিন টি হোল্ডিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহসিন মিয়া মধুর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন বাগানের ম্যানেজার ফয়সল আহমদ পাভেল।
এছাড়া সর্বোচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পুরস্কার পেয়েছে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার মধুপুর চা বাগান, শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারক ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রামের দি কনসোলিডেটেড টি এন্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়তন চা উৎপাদনকারী ক্যাটাগরিতে পুরস্কার গ্রহণ করেন পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের মোঃ মতিয়ার রহমান, শ্রমিক কল্যাণের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ চা বাগান ক্যাটাগরিতে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর চা বাগান, বৈচিত্র্যময় চা পণ্য বাজারজাতকরণের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে ঢাকার কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড, দৃষ্টিনন্দন ও মানসম্পন্ন চা মোড়কের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ চা প্রতিষ্ঠান ঢাকার কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড, শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী (শ্রমিক সম্পর্কিত পুরস্কার) চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ন হাট এরাকার নেপচুর চা বাগানের জেসমিন আক্তার এবং শ্রেষ্ঠ বটলিফ চা কারখানা ক্যাটাগরিতে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার জগদল এলাকার সুপ্রিম টি লিমিটেড।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চা আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যর প্রতীক। দিনের শুরুতে চা পান করে না এমন ব্যক্তি পাওয়া দুষ্কর। বর্তমান সরকারের দিক-নির্দেশনায় বৈষম্যহীন দেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ চা বোর্ড সকল অংশীজনদের সাথে নিয়ে চা ল্পিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য নিরলসভাবে বাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার গৃহীত নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে চা শিল্প আজ টেকসই এবং মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মেইন ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
চা শিল্পের উন্নয়নের লক্ষে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন অভ্যন্তরিন চাহিদা পূরণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে চা বোর্ড। ইতোমধ্যে চা বোর্ড বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চা বোর্ডের সকল লাইসেন্স ডিজিটাল করা হয়েছে। দেশের সকল চা বাগানের তথ্যপ্রাপ্তির লক্ষে বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি এবং দুটি পাতা একটি কুঁড়ি নামে দুইটি মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়েছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে চা শিল্পকে সুরক্ষিত রাখতে খরা ব্যবস্থাপনাসহ বিটিআরআই ইতোমধ্যে ২৩টি ক্লোন ও ৫টি বাইক্লোন উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি চা শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও গুণগতমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালে মোট ৯৪.৯৩ বিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রচ্য ইউরোপসহ ২৫টি দেশে ১.৬৪ বিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করা হয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য চা রপ্তানি করা হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, চা শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত বিএনপি সরকারের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চা শ্রমিক পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিয়েছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে সকল চা শ্রমিকরা এ ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসবেন।
এছাড়া চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে টেকসই আবাসন নির্মাণ বরাদ্দপত্র, চা শ্রমিক সন্তানদের স্কলারশিপসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চা শিল্প এবং শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে সরকার বদ্ধপরিকর।
সভায় চা শিল্পের সংকট ও উত্তরণের উপায় সম্পর্কে নানা মতামত তুলে ধরেন চা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংকট সমাধানে সরকারের সহযোগিতা চান বাগান মালিকরা। রপ্তানি বাড়াতে চায়ের গুণগত মান উন্নয়ন আর ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের দাবি সংশ্লিষ্টদের। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৭২টি নিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি চা বাগান অবস্থিত মৌলভীবাজার জেলায়।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

