AB Bank
  • ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

কষকের কান্না থামাবে কে? টপসয়েল হুমকিতে কৃষিজমি



কষকের কান্না থামাবে কে?  টপসয়েল হুমকিতে কৃষিজমি

কৃষকের কান্না থামাবে কে? লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় পরিবেশ ও কৃষি আইনের তোয়াক্কা না করেই চলছে ইটভাটার দৌরাত্ম্য। প্রশাসনের দফায় দফায় অভিযান, জরিমানা আর সতর্কবার্তার পরও রামগঞ্জে থামানো যাচ্ছে না ফসলি জমির মাটি কাটা। দিনের পর দিন উর্বর কৃষিজমি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

ফলে চাষাবাদের জমিতে বিশাল বিশাল গর্ত। একেকটি গর্তের গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ ফুট। অনেকগুলো গর্তেই পানি জমে জলাশয় সৃষ্টি হয়েছে। ইটভাটার জন্য ফসলি জমির মাটি কেটে এসব গর্ত ও জলাশয়ের সৃষ্টি করা হয়েছে। এমপির নির্দেশনারও তোয়াক্কা করছে না ভূমিদস্যু চক্র। তাদের কাজ থেকে বাঁচতে জেলা প্রশাসক, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), এসিল্যান্ড, কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়ারা।

ভুক্তভোগীরা জানান, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এমপি কৃষিজমির টপসয়েল কাটা নিষিদ্ধ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে জেল-জরিমানার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বক্তব্য দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।

রামগঞ্জ উপজেলার ১৯টি ইটভাটায় প্রতি বছর ইট তৈরির জন্য পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট মাটি। যার পুরোটাই সংগ্রহ করা হচ্ছে ফসলি জমির টপসয়েল কেটে অথবা কৃষিজমি গভীরভাবে খনন করে। এতে দ্রুত হারে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি, বাড়ছে অনাবাদি জমি এবং ভয়াবহভাবে কমছে ফসল উৎপাদন। এ জন্য কৃষি অফিসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।

জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গভীর রাতে ভেকু মেশিন ও ট্রাক দিয়ে জমির ওপরের উর্বর স্তর কেটে নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযান শেষ হলেই আবার শুরু হয় একই কাজ। মাঠে ফসল নেই, আছে শুধু বিশাল গর্ত আর জমে থাকা পানি। জমিন মাটি নিতে উপজেলার ছোট-বড় সড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় শতাধিক মাটিবাহী এই ট্রাক্টর। অনভিজ্ঞ চালক ও লক্কড়-ঝক্কড় যান দিয়ে মাটি বহন করে সড়কের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।

বিশেষ করে ধুলাবালির কারণে সড়কে হেঁটে চলাচলকারী জনসাধারণ এবং স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে প্রশাসন শক্ত অবস্থানে থাকায়, খবর পাওয়া মাত্রই প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তারপরেও রাজনৈতিক দলের নেতা পরিচয়ে মাটি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যক্তি।

এতে একদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে চলছে মাটিকাটার মহোৎসব। রাত-দিন ভেকু এক্সকাভেটর দিয়ে শত শত অবৈধ ট্রলি ও ফিটনেসবিহীন পিকআপে করে দালালের মাধ্যমে কৃষিজমির মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এতে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ইটভাটা গুলো গড়ে উঠেছে কৃষি মাঠে আবাদি জমিতে। ইটভাটা স্থাপনে অনুমোদিত জমি ৩ একর হলেও ভাটার মালিকরা দখল করছেন কমপক্ষে ৭-৮একর করে। সে হিসেবে ইটভাটার নিচে প্রায় ১ হাজার ৫০ একর জমিও চলে গেছে। ভাটার মালিকরা ইট তৈরীতে ব্যবহার করছেন পাশ্ববর্তী কৃষি মাঠের ফসলি জমির টপসয়েল এবং  ফসলি জমি ১০-২০ ফুট খনন করে আনা মাটি। দেহলা, সমেষপুর, কেথুড়ি, শৈরশৈই, রাজারামপুর,মধ্যভাদুর, ভোলাকোট  কৃষি মাঠে দেখা যায়, ফসলি জমি উপরি স্তর বা টপসয়েল কেটে নিচ্ছে।

এ ছাড়াও ১৫-২০ ফুট খনন করা শত শত পুকুর। কৃষি মাঠে দেখা যায় অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে। কয়েকজন ইটভাটার মালিক ও ভাটার ম্যানেজার সাথে কথা বলে জানা যায়-ইটের আকার অনুসারে একটি কাঁচা ইট তৈরিতে মাটি লাগে ০.০৮৫ ঘনফুট। বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিটি ভাটায় কমপক্ষে গড়ে ৮ রাউন্ড ইট পোড়ানো হয়। প্রতি রাউন্ডে ৮-১০ লাখ ইট থাকে। তার হিসেবে মতে, একেকটি ভাটায় বছরে কমপক্ষে ৭০-৮০ লাখ ইট পোড়ানো হয়।

তার হিসেবে, রামগঞ্জে ১৯টি ইটভাটায় বছরে ইট উৎপাদন হয় ১৫ কোটি । যার জন্য বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট মাটি প্রয়োজন। এছাড়াও তাদের দেওয়া তথ্য মতে একটি ইটভাটায় ৭-৮ একক জমি ব্যবহার করা হয়। সে হিসেবে ১৯টি ইটভাটার নিচে প্রায় ১ হাজার ৫ শত একর জমি রয়েছে। স্থানীয় সফি উল্যাহ ভূইয়া নামে একজন  সার্ভেয়ার জানান, ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট মাটির জন্য ১ ফুট গভীরতায় প্রায় ১ শত ৩৯ হেক্টর জমির মাটি কাটতে হয়।

রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় কৃষি জমির পরিমান ১৬ হাজার ৯শত হেক্টর। ২০২৪-২৫ সালে চাষাবাদ হয়েছে ১২ হাজার ৮ শত হেক্টর জমি। ২০২৫-২৬ সালে চাষাবাদ হয়েছে ১১ হাজার ২ শত হেক্টর। বর্তমানে অনাবাদি জমির পরিমান ৭ হাজার ৭ হেক্টর। প্রতি বছর গড়ে অনাবাদি জমি বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় ১-২শত হেক্টর জমি। পাশাপাশি প্রতি বছর গড়ে উৎপাদন কমছে ৮ থেকে ১০ হাজার মেট্রিক টন ফসল।

আনোয়ার হোসেন নামের একজন কৃষি শিক্ষক জানান, কৃষি জমির উপরের স্তর বা টপসয়েল কেটে নিলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়, ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে না, জমি অনুর্বর হয়ে যায়। এতে জমি ফসল উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে পেলে। ফলে ফসল উৎপাদন কমে গিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য সংকট তৈরি হয়। জমি টপসয়েল একবার কেটে নিলে তা পূরণ হতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়। টপ সয়েল জমির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর।

উপজেলার ভাদুর ইউনিয়নের সমেষপুর গ্রামের আবু জাফর জানান, তার জমির পাশের জমি থেকে ইটভাটার মালিক ও মাটি ব্যবসায়ীরা ২০ফুট মাটি কেটে নিয়ে যায়, এতে তার জমি পুকুরে ভেঙ্গে যাচ্ছে। ঠিকমত ফসল হয় না, তাই বাধ্য হয়ে নিজের জমির মাটি বিক্রি করতে হয়েছে। এ ভাবে ইটভাটার মালিক ও মাটি ব্যবসায়ীরা জমির মালিকদেরকে বাধ্য করছেন জমি অথবা জমির মাটি বিক্রি করতে।

উপজেলার ভাদুর ইউনিয়নের সমেষপুর গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান, সিরাজ মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক জানান, তার জমির পাশে ইটের ভাটা। রাত-দিন সেখানে পুড়ছে ইট,উড়ছে কালো ধোঁয়া। এদিকে  মাটি কেটে নেওয়া কারনে জমি গুলোতে গর্তের সৃষ্টি  হয়ে জলাবদ্ধতায় চাষাবাদ করা যায় না, ঠিক মতো ফসলও হয় না।  তাই তারা চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

উপজেলার সিরুন্দি গ্রামের আনোয়ার হোসেন,শাকতলা গ্রামের রেজাউল করিম, কাঞ্চনপুর গ্রামের মাসুদ আলম বলেন, ইটভাটা অনুমোদনে কোনো রকম পরিদর্শন না করেই ছাড়পত্র দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর, ৩ ফসলি জমিকে অনাবাধি দেখিয়ে ছাড়পত্র দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। এ রকম বৈধতা তো পুরোটাই অবৈধ। এ ব্যাপারে প্রশাসনের তদারকির অভাবে কৃষি জমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সাব্বির আহমেদ সিফাত জানান, কৃষি জমির টপ সয়েল কাটা এবং পুকুর খনন করা দন্ডনীয় অপরাধ। রামগঞ্জে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কৃষি মাঠ থেকে টপসয়েল কাটা হচ্ছে এবং কেউ কেউ ফসলি জমি থেকে ১০ থেকে ১৫ ফুট গভীর করে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতি বছর অনাবাদি জমি বাড়ছে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমরা মাসিক আইন শৃংখলা সভায় উপস্থাপন করে আসছি। প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে আমরা উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ঠিক রাখার জন্য আধুনিক জাতের বীজ ও কৃষি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করছি।

রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান জানান, টপসয়েল কাটা একটি ভয়াবহ কাজ। কোথাও ফসলি জমির টপসয়ের কাটার সংবাদ পেলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোথাও টপসয়েল কাটা অবস্থায় অপরাধীকে পাওয়া গেলে জেল দেওয়া হবে। আর অপরাধী পাওয়া না গেলে নিয়মমিত মামলা দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

 

একুশে সংবাদ/ওজি

সর্বোচ্চ পঠিত - সারাবাংলা

Link copied!