ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকে তীব্র ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। এক সময় এসব ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ২২ প্রকারে আনা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গর্ভবতী মায়েদের জন্য আয়রন ও অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট ছাড়া প্রায় কোনো ওষুধই মিলছে না।
কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট পাওয়া গেলেও অধিকাংশ ক্লিনিকের ওষুধের আলমারি ফাঁকা পড়ে রয়েছে।
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলমান এই সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে রোগীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
উপজেলায় প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে মোট ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে এসব ক্লিনিকে ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই ওষুধ নভেম্বর–ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এরপর চলতি বছরে নতুন করে কোনো ওষুধ সরবরাহ না আসায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোর কিপার ওমর ফারুক বলেন, “ওষুধ সংকট আছে। আগের মতো আর ওষুধ আসে না। এখন যা আসে, তা ক্লিনিকগুলোতে ভাগ করে দেওয়া হয়।”
বীরহলি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ নিতে আসা এক নারী রোগী বলেন, “আমরা এখানে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি, ব্যথা, গ্যাস, আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ বিনামূল্যে পেতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো ওষুধ পাচ্ছি না। ওষুধ নিতে এলেই বলা হয়, ওষুধ নেই। আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে পারি না।”
বৃদ্ধিগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকের নুরজাহান ও আপুরজা বলেন, “গরিব মানুষের জন্য এই ক্লিনিকগুলো খুবই জরুরি। ওষুধ না থাকায় আমাদের কষ্ট বাড়ছে। ভাড়া খরচ করে শহরে গিয়ে ওষুধ নেওয়াও সবসময় সম্ভব হয় না।”
ভাকুরা কমিউনিটি ক্লিনিকে আসা মনিরা খাতুন বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা সম্ভব হয় না। আগে এখানে বিনামূল্যে ওষুধ পেতাম। কিন্তু অনেক দিন ধরে কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।”
এদিকে ওষুধ সংকটের কারণে রোগীদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও।
চন্দরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি বেবী নাজনীন বলেন, “প্রায় পাঁচ মাস ধরে কোনো ওষুধ পাই না। প্রতিদিন জ্বর, সর্দি-কাশি, দুর্বলতা নিয়ে রোগীরা আসে, কিন্তু এসব ওষুধ নেই। এতে রোগীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে, আমরাও বিব্রত হচ্ছি।”
নারায়ণপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের আনজুরা জাহান বলেন, “রোগীরা যাতে মনঃক্ষুণ্ণ না হন, সে জন্য আমরা স্বাস্থ্য পরামর্শ দিচ্ছি। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন পরিচর্যা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের কাছে শুধু আয়রন ট্যাবলেটই রয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. আবুল বাসার মোঃ সাইদুজ্জামান বলেন, “কয়েক মাস ধরেই ওষুধের সংকট চলছে। কিছু ওষুধ এসেছে, সেগুলো ক্লিনিকগুলোতে ভাগ করে দেওয়া হবে। নতুন অর্থবছরের বাজেট ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।”
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিসুর রহমান বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সংকট রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি কোরবানির ঈদের আগে বা পরে সমস্যা সমাধান হবে।”
একুশে সংবাদ/যাবিদ



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

