মৌলভীবাজারের দি ফ্লাওয়ার কেজি এন্ড হাইস্কুলের কেজি-২ এর শিক্ষার্থী ফাদিলা ইনায়া রাফা নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধায় ওই স্কুলের শিক্ষক রোকসানা আক্তার তার ফেসবুক আইডিতে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এক স্ট্যাটাস দেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, `গভীর শোক ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাচ্ছি যে, আমাদের শিক্ষার্থী KG-2 শ্রেণির ছোট্ট ফাদিলা ইনায়া আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এতো অল্প সময়ে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া নিষ্পাপ এই শিশুটির চলে যাওয়া আমাদের বিদ্যালয় পরিবারকে শোকাহত করেছে।
ছোট্ট এ শিশুর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। মহান আল্লাহ যেন ছোট্ট ফাদিলা ইনায়াকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই কঠিন সময় ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করেন। পোস্টের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে শিশুর রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়াও চেয়েছেন।
নিহত শিশুর রাফা কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের পূর্ব হাশিমপুর নিবাসী জোনাব আলীর একমাত্র সন্তান। তিনি ব্যাংক কর্মকর্তা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার শিশু রাফার শরীরে সামান্য জ্বর দেখা দেয়। প্রাথমিক অবস্থায় বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও ঘটনার দিন ভোরবেলা হঠাৎ তার পুরো শরীর অবশ হয়ে যেতে শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত তাকে সিলেটের মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তির পরামর্শ দেন। টানা তিন দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ভোর ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
মেধাবী এই শিশুটির মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত ১৫ দিনে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হলেও সরকারি টিকাদান কর্মসূচির দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলায় এ পর্যন্ত ৩৮৯ জনের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে ১৮ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে।
গত ১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৩টি শিশু মারা গেছে।
মৃতদের মধ্যে একজনের বয়স ১ বছর ৫ মাস এবং বাকি দুজনের বয়স ৯ মাস। মৃত তিনজনের মধ্যে শ্রীমঙ্গলের একজনের রিপোর্ট পজিটিভ এলেও বাকি দুজনের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস জানান, হাসপাতালে রোগীর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। গত এক সপ্তাহে নিউমোনিয়া, জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে ৫৪ জন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৯৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
এর বাইরে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৯৫ জন। জায়গার সংকুলান না হওয়ায় শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগীদের মেঝের বিছানায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে অন্তবিভাগে ১ হাজার ৮৯৫ জন এবং বহির্বিভাগে ৫ হাজার ৬৬১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এই সময়ে হাসপাতালে মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৭ জন বার্ধক্যজনিত কারণে, একজন নবজাতক এবং ৫০ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি ডায়রিয়া ও ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় মারা গেছেন।
সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান তিন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, জেলায় ২ লাখ ৪ হাজার ৯২৮ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৬৭ জনকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রতিদিনের লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ৬৬৪ জন হলেও বর্তমানে গড়ে ৭ হাজার ৫৮৮ জনকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০৬ জন কম টিকা পাচ্ছেন।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

