রাজশাহীর তানোরে চলতি বোরো মৌসুমে এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি হচ্ছে না। এতে বোরো চাষিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। বহিরাগত শ্রমিক না আসা এবং ধান মাটিতে নুয়ে পড়ায় শ্রমিকদের চাহিদা বেড়েছে। ফলে বোরো চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, প্রতি বিঘায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।
বর্তমানে প্রতি মণ ধান ৮৩০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে মোকাম থেকে পরিবহন কম থাকায় ধানের দাম কমেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এ পরিস্থিতিতে কৃষকেরা হাট বা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি ধান সংগ্রহের দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, উপজেলার বিলকুমারী বিলে আগাম বোরো চাষ হয়ে থাকে। আলু উত্তোলনের পর মার্চ মাসের শুরুতে আরেক দফা বোরো চাষ শুরু হয়। চান্দুড়িয়া ব্রিজ ঘাট থেকে তানোর পৌরসভা হয়ে কামারগাঁ ইউনিয়নের মালশিরা চৌবাড়িয়া ব্রিজ ঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় এ চাষাবাদ হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে বেশির ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত ফলন হলেও আধাপাকা ধানের কারণে এটিকে প্রকৃত ফলন হিসেবে দেখছেন না চাষিরা।
বিলপাড়ের কৃষক তোফা জানান, সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। ধান কেটে বাড়ির আঙিনায় মাড়াই করে বিক্রি করছেন। কিন্তু বাজারদর একেবারেই কম। প্রতি মণ ৮৫০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। বিঘাপ্রতি ৬ মণ ধান শ্রমিকদের দিতে হয়েছে। গত বছর যেখানে মাড়াই খরচ ছিল ১৫ কেজি ধান, সেখানে এবার দিতে হচ্ছে ২০ কেজি।
আরেক কৃষক ফারুক জানান, ২৪ কাঠা জমির ধান কাটতে ৮ জন শ্রমিক লেগেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজের জন্য প্রতিজনকে ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে। পুরো দিনে শ্রমিকপ্রতি মজুরি ১২০০ টাকা। অথচ এক মণ ধানের দাম মাত্র ৮৫০ টাকা।
কৃষকদের অভিযোগ, বহিরাগত শ্রমিক না আসায় স্থানীয় শ্রমিকদের চাহিদা বেড়েছে। তারা এখন চুক্তিতে কাজ না করে মজুরিভিত্তিক কাজ করছেন। ফলে ধান কাটার খরচ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিপণ্যের মধ্যে ধানের দাম কম হলেও চালের দাম বেশি—এ অবস্থায় চাষিরা চরম সংকটে পড়েছেন।
তারা আরও জানান, সরকারিভাবে প্রতি কেজি বোরো ধানের দাম নির্ধারণ করা হলেও সরাসরি বিক্রিতে নানা জটিলতা ও হয়রানির কারণে কৃষকেরা সে সুবিধা পাচ্ছেন না। হাট পর্যায়ে সরাসরি ধান ক্রয় বা নির্ধারিত দামে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করলে কৃষকেরা কিছুটা উপকৃত হবেন বলে মনে করেন তারা।
কৃষক শাকির জানান, তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছেন। বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ২৬ মণ। রোপণ থেকে কাটা পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। ধান কাটা, পরিবহন ও মাড়াইসহ মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ হাজার টাকা। সেখানে ধান ও খড় বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, বিলকুমারী এলাকার প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা মোটের ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো এলাকার ধান কাটা শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একুশে সংবাদ/যাবিদ



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

